ব্যক্তি নির্ভর রাজনীতি বনাম গণতান্ত্রিক চেতনা: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

🔶 ভূমিকা

বাংলাদেশের রাজনীতি যেন এক অবিচ্ছেদ্য নাট্যশালার মঞ্চ, যেখানে কেবল কয়েকজন চিরচেনা অভিনেতার আবর্তে কাহিনী আবদ্ধ। প্রতিনিয়ত আমরা শুনি—শেখ হাসিনা না খালেদা জিয়া, কিংবা মাঝে মাঝে উঠে আসে ডঃ ইউনুসের নাম। রাজনৈতিক আলোচনায় নীতির চেয়ে ব্যক্তির গুরুত্ব বেশি, আর গণতন্ত্র রয়ে গেছে স্লোগানে বন্দি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কি কেবল ব্যক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? এবং যদি সেই ব্যক্তি হঠাৎ না থাকেন, তখন কী ঘটে?


🔶 ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির বাস্তবতা

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো বেশিরভাগ সময় ব্যক্তির নামেই পরিচিত।

  • আওয়ামী লীগ মানে শেখ হাসিনা
  • বিএনপি মানে খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান
  • বিকল্প চিন্তা মানেই ইউনুস বা কেউ “নতুন”
    দলীয় গঠনতন্ত্র, আদর্শ, রাজনৈতিক কর্মসূচি বা গণতান্ত্রিক চর্চা তেমন আলোচনার মধ্যেই আসে না।

এই সংস্কৃতি আমাদের রাজনীতিকে এমন এক পর্যায়ে এনেছে, যেখানে জনগণও নেতৃত্বের গুণাবলি নয়, বরং ‘কে’ সেটা করছে, সেটাই বড় করে দেখে।


🔶 জুলাই আন্দোলন ২০২৪: একটি উদাহরণ

২০২৪ সালের জুলাই মাসে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, যা শুরু হয়েছিল ‘নির্বাচনী সংস্কার ও কোটাপদ্ধতির পুনর্বিন্যাস’ দাবিতে, দ্রুতই রূপ নেয় একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক অস্থিরতায়।

  • ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ মিছিলকে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার বানায়
  • আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে
  • সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে গুজব ও উসকানিমূলক ভিডিও
  • সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যানবাহন, সরকারি অফিস, এমনকি কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও

এই সময় দেখা যায়, যেখানে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ছিলেন নেপথ্যে, সেখানেই সমাজে নেমে আসে বিশৃঙ্খলা। আন্দোলনের কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না, আর সেই শূন্যস্থানেই দানা বাঁধে সহিংসতা ও বিভ্রান্তি।


🔶 আইনের শৃঙ্খলা ও অবনতি

জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী সময়গুলোতে দেখা যায়—

  • ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ শুরু হয়
  • ব্লগার, ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকদের গ্রেফতার বৃদ্ধি পায়
  • সাইবার টহলের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি হয়
  • পুলিশ-র‍্যাবের উপস্থিতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বেড়ে যায়, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের বিপরীত

এতে বোঝা যায়—ব্যবস্থা না বদলে কেবল ব্যক্তি বদলালে আসলে কাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয় না। বরং আইন ব্যবহৃত হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রতিহিংসায়।


🔶 জনগণের ভূমিকা ও দায়

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে: আমরা জনগণ কী করছি?

  • আমরা ভোট দেই, কিন্তু নীতি দেখে না, দল দেখে
  • দুর্নীতি দেখি, কিন্তু প্রতিবাদ করি না
  • সামাজিক অন্যায় মেনে নেই, যদি আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে আঘাত না লাগে

আর একবার কোনো ব্যক্তি ক্ষমতা হারালে, আমরা হিংসায় ফেটে পড়ি। তার পতন মানেই যেন আমাদের মুক্তি। অথচ সিস্টেম বদলায় না।

এটাই হলো “অসভ্যতার প্রতিফলন” — যা আমরা হাসিনার পরবর্তী ঘটনাবলিতে স্পষ্ট দেখেছি।


🔶 সমাধানের পথ

১. রাজনৈতিক শিক্ষার প্রসার
গণতন্ত্র মানে কেবল পাঁচ বছর পর ভোট নয়, প্রতিদিনের নৈতিক অংশগ্রহণ।

২. দলীয় গণতন্ত্রের চর্চা
নেতৃত্ব নির্বাচনে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী ব্যবস্থা থাকা উচিত।

৩. প্রতিষ্ঠান ও নিয়মের প্রতি আস্থা তৈরি
ব্যক্তি নয়, আইন ও প্রক্রিয়াই হোক সর্বোচ্চ।

৪. তরুণ সমাজের জাগরণ
শিক্ষিত, যুক্তিবাদী তরুণদের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে। শুধু ফেসবুকে পোস্ট দিয়েই দায় এড়ানো যাবে না।


🔶 উপসংহার

বাংলাদেশের রাজনীতিকে ব্যক্তি নির্ভরতামুক্ত করতে হলে আমাদের চিন্তায় ও কর্মে পরিবর্তন আনতে হবে। ইতিহাস সাক্ষী—যে জাতি কেবল নেতার ওপর নির্ভর করে, সে জাতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

আসুন, আমরা ব্যক্তি নয়—নীতি, দল নয়—প্রক্রিয়া, নেতা নয়—প্রতিষ্ঠানকে মূল্য দিতে শিখি। তবেই গড়বে এক আধুনিক, প্রগতিশীল ও সহনশীল বাংলাদেশ।


✒️ লেখকের নোট:

আপনি যদি এই প্রবন্ধটি শেয়ার করতে চান, দয়া করে লেখকের নাম এবং উৎস উল্লেখ করুন। আলোচনা, বিতর্ক ও মতামতের জন্য আমন্ত্রণ রইলো।

Leave a comment