মুসলমান সমাজে একটি ব্যাপক প্রচলিত বিশ্বাস আছে—যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়, তবে সব ইহুদি, খ্রিষ্টান, নাস্তিক, কাফের একেবারে ছাই হয়ে যাবে, আর মুসলমানদের জয় হবে সর্বত্র। ইসলাম ছড়িয়ে পড়বে নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ার থেকে শুরু করে মস্কোর লাল স্কোয়ার পর্যন্ত। এমনকি গুগলের লোগোও কালেমা পড়ে উঠবে।

অনেকের ধারণা, তখন সব মুসলমান তরবারি হাতে ঘোড়ায় চড়ে “আল্লাহু আকবার” বলে দুনিয়া জয় করবে। ব্যাপারটা যেন “Game of Thrones” আর “বদর যুদ্ধ” মিলিয়ে একটা নতুন ওয়েব সিরিজের মতো শোনায়।

ইহুদিরা ধ্বংস হবে? কিন্তু তারা এখন কোথায়?

একটু বাস্তবতা দেখা যাক।

ইসরায়েল নামের ছোট্ট একটা রাষ্ট্র—আয়তনে বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের সমান, জনসংখ্যায় ঢাকার অর্ধেক। কিন্তু প্রযুক্তি, সেনা শক্তি, কূটনীতি, বুদ্ধিমত্তা, আর আন্তর্জাতিক প্রভাবের দিক দিয়ে তারা এমন লেভেলে যে তারা sneeze করলেও জাতিসংঘ কাশি ধরে বসে।

এদিকে মুসলিম বিশ্ব কী করছে?
একজন মুসলিম দেশ আরেকজন মুসলিম দেশকে গালি দিচ্ছে, কখনও গুলি ছুঁড়ছে। কোনো মুসলিম দেশ রাশিয়ান অস্ত্র কিনছে, কেউ কিনছে আমেরিকান। কেউ কেউ এখনো উটের দুধে আর মুতে করোনা চিকিৎসার গবেষণায় ব্যস্ত।

করোনা যখন ‘আল্লাহর সৈনিক’—সেই সৈনিক কার কথা শুনল?

করোনা মহামারি আসার সময় অনেকেই বলেছিলেন, “এই রোগ আল্লাহর সৈনিক। আল্লাহ কাফেরদের শাস্তি দিতে পাঠিয়েছেন।”

কিন্তু দেখা গেল—ভাইরাস তো মুসলমানদেরও ভেদ করে ঢুকল। এমনকি যে হুজুর বলেছিলেন সুরা ফাতেহা সকল রোগ নির্মূল করে সেই হুজুর সাহেবও ICU-তে গিয়ে বললেন, “দয়া করে আমাকে রেমডেসিভির দিন।”

আর শেষে কী হলো?

মুসলিম বিশ্ব তাকিয়ে রইল ইহুদি, নাসারা, চীনা, জার্মান বিজ্ঞানীদের দিকে—যাঁরা টিকা বানিয়ে দিচ্ছেন, ভেন্টিলেটর দিচ্ছেন, গবেষণা করে ভাইরাস ধরছেন। কেউ বলল ফাইজার হারাম, কেউ বলল হালাল—কিন্তু সবশেষে সবাই হাত গুটিয়ে ফাইজার-ই নিয়ে নিল। তখন আর কেউ সাহাবাদের মত উটের দুধে আর মুতে এবং আজোয়া খেজুর খেয়ে রোগ সারানোর কথা বলল না।

কাবাঘর জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার — এবং ঈমানের টান

আরেকটু মজার বাস্তবতা:

যখন করোনা ভয়ঙ্কর পর্যায়ে পৌঁছাল, তখন পবিত্র কাবাঘর জীবাণুমুক্ত করার জন্য ব্যবহার করা হলো ইহুদিদের তৈরি জীবাণুনাশক। শুনে কেউ কেউ আবেগে কেঁদে ফেলল। “ইহুদির বানানো Dettol দিয়ে কীভাবে কাবা পরিষ্কার হয়?” ঈমান তো সেদিনই ধবংস হয়ে গেল।

তখন কেউ একজন বলে উঠল: “ভাই, মুসলমানদের তৈরি জীবাণুনাশক কই?”
উত্তরে আরেকজন হেসে বলল: “আমরা তো জীবাণু বুঝিনা, শুধু জ্বিন আর বদর যুদ্ধ বুঝি। বিজ্ঞান তো কেবল ‘কাফেরদের কাজ’!” আর হাদিসে আছে “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই।” হায়াত মউত সব আল্লাহর ইচ্ছা।”

একটু পরিসংখ্যান, একটু গণনা

  • বিশ্বের ২০০ কোটির মতো মুসলমানের মধ্যে আধুনিক বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও প্রযুক্তিতে মুসলিম দেশের অবদান কতটুকু?
  • নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ইহুদি বিজ্ঞানীর সংখ্যা ২০০’র বেশি, মুসলমানদের মধ্যে বিজ্ঞান ক্যাটাগরিতে কয়জন?

এই প্রশ্নগুলো করলে অনেকে বলবেন: “এগুলো তো দুনিয়াবি জিনিস। আমাদের আখেরাতের চিন্তা আছে।”

ঠিকই আছে। কিন্তু দুনিয়ায় টিকে থাকতে হলে অন্তত এই দুনিয়াটার ভাষা তো জানতে হবে, না?

মুসলমানরা বসে আছে ‘তীর্থের কাকের মতো’: ইমাম মাহাদি কোথায়?

আজকের মুসলিম সমাজের বড় একটি অংশ মাহদির আগমনকে এমনভাবে দেখছে যেন তিনি এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে—দুর্নীতি দূর হবে, শাসকেরা ন্যায়পরায়ণ হবে, আর কাফেররাও হঠাৎ করে কালেমা পড়ে ফেলবে। তাই কেউ কেউ ভাবছে, নিজেরা কিছু না করলেও চলবে, ইমাম মাহদি এসে সব ‘Fix’ করে দেবেন। ফলে মুসলমানরা বসে আছে ঠিক তীর্থের কাকের মতো—যেখানে শুধু অপেক্ষা আর প্রত্যাশা, কিন্তু কোনো আত্মসংগ্রাম বা প্রস্তুতি নেই।

আধুনিক বাস্তবতায়:

ইমাম মাহদি সম্পর্কে অনেক মানুষ বিভিন্ন দাবি করে থাকেন। ইতিহাসে অনেকে নিজেকে মাহদি দাবি করেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু মূলধারার ইসলাম মনে করে, তার আগমনের নির্দিষ্ট সময় কেউ জানে না। এটি গায়বের অন্তর্ভুক্ত। তিনি কতদিন গায়েব থাকবেন বলা মুস্কিল।

সত্যিকার জিহাদ কী?

আজকের জিহাদ হলো অজ্ঞতা, কুসংস্কার, আত্মতুষ্টি, গোঁড়ামি, দুর্নীতি ও অলসতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম।
যুদ্ধ যদি হয়ই, তাহলে তা হওয়া উচিত কলম আর গবেষণার মাধ্যমে।
সত্যিকার জিহাদ হচ্ছে—ভবিষ্যতের মুসলিম শিশুদের এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তারা পরবর্তী বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, দার্শনিক, ন্যায়বিচারক হতে পারে।

শেষ কথায় একটু হাসি, একটু কান্না

মুসলমানরা যদি ভাবে—‘আমরা কিছু না করলেও আল্লাহ আমাদের জয় দেবেন’, তাহলে সেটা এমন এক ছাত্রের মতো, যে সারা বছর পড়াশোনা না করে বলে, “আমার দোয়া আছে, ইনশাআল্লাহ পাশ হব।”
আর পরীক্ষার দিন দেখে—হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, নাস্তিকরা সবাই বই পড়ে তৈরি হয়ে এসেছে—তখন সে চুপচাপ তাদের কাছ থেকে ‘উত্তর দেখে’ পাশ করার চেষ্টা করে।

বস্তুত, আল্লাহও সাহায্য করেন কেবল তাদেরই, যারা নিজেরাও নিজেদের সাহায্য করে।


পাঠকের জন্য প্রশ্ন:
আপনি কী মনে করেন? আমরা কি শুধু আত্মতুষ্টির বেলুনে চড়ে আছি, নাকি সত্যিই উন্নতির কোনো পথে হাঁটছি?

Leave a Reply

Discover more from সত্যের সন্ধানী

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading