শিল্প ও শিল্পী সত্যিই দেশ, জাতি, বা ভৌগোলিক সীমানার ঊর্ধ্বে। কারণ শিল্প সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য মানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, ও আবেগ প্রকাশ করা, যা সর্বজনীন এবং সীমানা দিয়ে বাঁধা নয়। এটি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটাতে পারে, এবং শিল্পীর কল্পনা ও সৃজনশীলতা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে পৌঁছাতে সক্ষম।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন একজন অনন্য প্রতিভাধর কবি, যিনি তাঁর সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা ও দার্শনিক চিন্তাভাবনার মাধ্যমে সময়কেও অতিক্রম করেছেন। তাঁর সৃষ্টি কেবল একটি বিশেষ সময়ের বা স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মানবতার সাধারণ বোধ এবং আবেগকে ধারণ করে, যা সব যুগের মানুষের কাছে প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা জাতীয় সঙ্গীত বর্তমানে তিনটি দেশে গাওয়া হয়। এই দেশগুলো হলো:

বাংলাদেশ: বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত “আমার সোনার বাংলা”। এই গানটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার সময় মানুষের মধ্যে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে এবং এটি দেশের স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে গণ্য।

ভারত: ভারতের জাতীয় সঙ্গীত “জন গণ মন”। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১১ সালে এই গানটি রচনা করেন, যা পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয়।

শ্রীলঙ্কা: শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীত “শ্রী লঙ্কা মাতা”-এর সুর মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বারা প্রভাবিত বলে ধারণা করা হয়। যদিও গানের ভাষা ও লেখক আলাদা, সুরের ক্ষেত্রে ঠাকুরের প্রভাব লক্ষ করা যায়।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত এবং তার কাজগুলোর প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে গেছে, যা তাকে সত্যিই এক চিরকালীন প্রতিভা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তবে আমাদের দেশে কিছু মানুষ তাকে ভারতীয়, হিন্দু, এবং মালু বলে গালি দিয়ে তার লেখা জাতীয় সঙ্গীত প্রত্যাখ্যান করছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো একজন প্রতিভাবান কবি ও সাহিত্যিককে তার ধর্ম, জাতীয়তা, বা অন্য কোনো সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা দুঃখজনক। তিনি শুধু ভারতীয় বা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ছিলেন না, বরং বিশ্বমানবতার প্রতীক হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর সৃষ্টি মানবিক মূল্যবোধ, শান্তি, প্রেম, ও জাতিগত ভেদাভেদমুক্ত সমাজের আদর্শ তুলে ধরে, যা সব দেশের এবং সব ধর্মের মানুষের জন্য প্রাসঙ্গিক।

জাতীয় সঙ্গীতকে প্রত্যাখ্যান করা বা তা নিয়ে বিভাজনমূলক ধারণা তৈরি করা আসলে সেই মূল্যবোধগুলোকেই অস্বীকার করে, যেগুলো আমাদের একত্রিত করে। “আমার সোনার বাংলা” গানটি শুধু একটি গানের চেয়ে বেশি—এটি বাংলাদেশের মাটি, প্রকৃতি, এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক। এটি আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এবং দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গভীর প্রভাব ফেলে।

যারা রবীন্দ্রনাথকে ধর্ম বা জাতীয়তার দৃষ্টিকোণ থেকে গালি দিয়ে তার কাজকে ছোট করে দেখেন, তারা আসলে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করছেন। তিনি একজন বাঙালি এবং তাঁর কাজ বাঙালি সংস্কৃতি ও মানসিকতার গভীরতম রূপগুলোকে প্রকাশ করে, যা আমরা সবাইকে গর্বিত করে।

এ ধরনের বিভেদমূলক মনোভাব পরিহার করে আমাদের উচিত তাঁর কাজের গভীরতা এবং মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি উপলব্ধি করা।

ইসলামে “জাতীয়তাবাদ” বা জাতীয়তাবোধ শুধুমাত্র হিন্দুদের বা ভারতের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এমনিতে তারা জাতীয় সঙ্গীত গায় না। কিন্তু একজন “মালুর” লেখা গান কেন দেশের জাতীয় সঙ্গীত হবে এই নিয়ে তাদের চিন্তার শেষ নেই। এখানে একজন পাকিস্থানির লেখা গান হলে কিন্তু মন্দ হতো না।

May be an image of 1 person and text

Leave a Reply

Discover more from সত্যের সন্ধানী

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading