ফেরাউন নিয়ে মুসলিমদের মিথ্যাচার – ইসলাম ধর্মের ফেরাউন গল্পের সত্যতা কতটুকু ?

মুমিনদের অনেকেকেই দেখা যায় এই প্রশ্ন করেন যে ফেরাউনের লাশ কীভাবে এতবছর সমুদ্রের নীচে থাকার পরেও অক্ষত রয়েছে? এটা আল্লাহ্ ও কোরানের মোজেজা!‌ কাফেরদের জন্য নিদর্শন সরূপ!! এর পরেও কি কাফের রা ঈমান আনবে না? ইত্যাদি ইত্যাদি ।

এর মধ্যে তারা আবার ডঃ মরিস বুকাইলির রেফারেন্স ও টেনে আনেন। তিনি একটা বই লিখেছিলেন কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান । তিনি নাকি এটা নিশ্চিত হয়ে বলেছেন যে মিশরের মমির গায়ে যে লবণ পাওয়া যায় সেটা নীল নদের থেকে এসেছে, এবং এটাই প্রমাণ করে যে কোরান সত্য। কিন্তু তাদের এই দাবী গুলি কতটুকু সত্যি?

কোরানের ফেরাউনের কিচ্ছা কাহিনী এবং মুমিনদের মিথ্যাচার

কুরানে [১০:৯০-৯২] ফিরাউন সম্পর্কে বলা হয়েছে,

“আর বনী-ইসরাঈলকে আমি পার করে দিয়েছি নদী। তারপর তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেছে ফেরাউন ও তার সেনাবাহিনী, দুরাচার ও বাড়াবাড়ির উদ্দেশে। এমনকি যখন তারা ডুবতে আরম্ভ করল, তখন বলল, এবার বিশ্বাস করে নিচ্ছি যে, কোন মাবুদ নেই তাঁকে ছাড়া যাঁর উপর ঈমান এনেছে বনী-ইসরাঈলরা। বস্তুতঃ আমিও তাঁরই অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত। এখন একথা বলছ! অথচ তুমি ইতিপূর্বে না-ফরমানী করছিলে। এবং পথভ্রষ্টদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলে। অতএব আজকের দিনে বাঁচিয়ে দিচ্ছি আমি তোমার দেহকে যাতে তোমার পশ্চাদবর্তীদের জন্য নিদর্শন হতে পারে। আর নিঃসন্দেহে বহু লোক আমার মহাশক্তির প্রতি লক্ষ্য করে না।”

মুসা নবী ও তার অনুসারীদের ধাওয়া করার সময় আল্লাহ ফেরাউন ও তার দলবলকে পানিতে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। সেই সাথে আল্লাহ ঘোষনা করেছেন কুরানে এই বলে যে, তিনি ফিরাউনের লাশকে সংরক্ষন করবেন ভবিষ্যত মানুষদের জন্যে নিদর্শন হিসেবে।

কুরানে ঠিক যেভাবে ফিরাউনকে সংরক্ষন করবে বলা হয়েছে, ঠিক সেভাবেই ফিরাউন সাগরের নীচ থেকে অক্ষত অবস্থায় আবিষ্কৃত হলো! মিশরের জাদুঘরে তার লাশ সংরক্ষিত আছে, চাইলে দেখে আসতে পারেন। চাক্ষুস প্রমাণ! আর ফিরাউনের লাশ নিয়ে গবেষণাকারী বিজ্ঞানী দলের প্রধান মরিস বুকাইলি এ ঘটনায় আশ্চর্য হয়ে ইসলাম গ্রহন করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ!

ফেরাউন আসলে কে?

প্রথমেই আমাদের জানা থাকা জরুরি যে, ফেরাউন কে বা কী। ফেরাউন বা ফারাওন কোন একক ব্যক্তি নয়। ফারাও হলো গ্রিক-রোমান কর্তৃক বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত প্রাচীন মিশরীয় রাজবংশের রাজাদের প্রচলিত উপাধি। পুরুষ রাজা, এমনকি ফেরাউন শব্দটা মহিলা শাসকদের হ্মেত্রেও ব্যবহার করা হত। তাই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, ফেরাউন কোন লোক নয়, একটা উপাধি। আমাদের দেশে যেমন এখন রাষ্ট্রপতি।

তাহলে কোন ফেরাউনের কথা কোরানে বলা হচ্ছে?

ফেরাউন আর মুসার যেই উপকথা, সেই উপকথা আসলে বিভিন্ন জায়গার আঞ্চলিক উপকথা, যা কয়েকটি প্রধান ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ঠিক কোন ফেরাউনের কথা বলা হয়েছে, তা নিয়ে ধর্মবিশারদ ঐতিহাসকদের মধ্যে নানা মতভেদ আছে। সেই আলোচনা আরেকদিন করা যাবে।

মমি কি?

মমি হলো একটি মৃতদেহ যা জীবের শরীরের নরম কোষসমষ্টিকে পচে গলে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। প্রাচীন মিশরে, উত্তর চিলিতে এবং দক্ষিণ পেরুতে মানুষ মৃতদেহ মমি করার কৌশল জানতো।

কার মমি পাওয়া গেছে?

১৮৮১ সালে যেই মমিটি পাওয়া যায়, সেই মমিটি দ্বিতীয় রামিসেসের। এই ফেরাউনের জন্ম (প্রায়) খ্রিস্টপূর্ব ১৩০৩; মৃত্যু জুলাই বা আগস্ট ১২১৩ খ্রিস্টপূর্ব; শাসনকাল হচ্ছে, ১২৭৯–১২১৩ খ্রিস্টপূর্ব।

উনাকে রামিসেস দ্য গ্রেট বা মহান রামিসেবলা হতো। তিনি ছিলেন মিশরের উনবিংশতম রাজবংশের তৃতীয় ফারাও রাজা।

মুমিনদের এবং ডঃ মরিস বুকাইলির মতে ফেরাউনের লাশ, যা ১২৩৫ খ্রিস্টপূর্বে সমুদ্রে ডুবে গিয়েছিল, ৩১১৬ বছর সমুদ্রের ভেতরে থাকবার পরেও আল্লাহর কুদরতে লাশটি অক্ষত রয়ে গেছে! এই মমিটি নাকি আবিষ্কার করা হয়েছে সমুদ্র থেকে। যা ডাঁহা মিথ্যা কথা।

সত্য হচ্ছে, ৯০ বা ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুর পরে এই ফেরাউনের মমি তৈরি করে তা ভ্যালি অব দ্য কিংসের একটি সমাধিতে কবরস্থ করা হয়; পরবর্তীতে তার দেহকে একটি রাজ সংগ্রহশালায় স্থানান্তর করা হয়, যেখানে ১৮৮১ সালে তা আবিষ্কৃত হয়, এবং বর্তমানে এটি কায়রো জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। এই ফেরাউনের এই মমিটি কখনোই সমুদ্রের তলদেশে ছিল না। ইসলামের সাথে মেলাবার জন্য খুব কৌশলে তথ্য বিকৃত করা হয়েছে।

কে ছিলেন ডঃ মরিস বুকাইলি?

ডঃ মরিস বুকাইলি ছিল সৌদি রাজপরিবারের চিকিৎসক। একজন ফরাসি চিকিৎসাবিদ। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত তার রচিত বাইবেল, কোরআন ও বিজ্ঞান গ্রন্থটির কারণে তিনি পরিচিত। 

রামেসিস -২ এর মৃতদেহ আবিষ্কার হওয়ার পর তার পচন রোধ কল্পে মমিটি ফ্রান্সে নেওয়া হয় এবং একদল ডাক্তার দিয়ে বোর্ড গঠন করে তা পরীক্ষা করার জন্য। এরপর পচনকৃত অংশের মেরামত করা হয়। মরিস বুকাইলি সেই কমিটির কেউ ছিল না। সৌদি রাজ পরিবারের ফরমায়েস অনুযায়ী সে বইটি লেখে – বাইবেল কোরান ও বিজ্ঞান।

এখন আসুন মরিস বুকাইলির দাবীতে। মমির শরীরে লবণ থাকার কারণে মরিস বুকাইলি দাবী করেন – এই লবণ যেহেতু পাওয়া গেছে, সেহেতু মমিগুলো অনেকদিন সমুদ্রের তলদেশে ছিল। সেটা একটা ডাঁহা মিথ্যা কথা।

মমি করার একটি ধাপে মমিকে শুষ্ক করে লবণ মাখানো হয়। পানি বা জলবায়ু আসলে মমির পচনকে তরান্বিত করে, এবং তা শুকাবার জন্যেই এক ধরণের লবণ ব্যবহার করা হতো। (মমি করার প্রক্রিয়া নিচে বিস্তারির দেওয়া হল)

মমি কিভাবে তৈরি করা হতো?

কয়েকটি ধাপে এই মমি বানানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হতো। প্রথমে মৃতব্যক্তির নাকের মাঝে ছিদ্র করে মাথার ঘিলু ও মগজ বের করা হতো। শরীরের বিভিন্ন পচনশীল অঙ্গ যেমন: ফুসফুস, বৃক্ক, পাকস্থলি ইত্যাদি বের করা হতো। এসব অঙ্গ বের করার পর আবার পেট সেলাই করে দেয়া হতো। এক্ষেত্রে তারা খুব সতর্কতা অবলম্বন করতো। কারণ পেট সেলাই করতে গিয়ে যদি পেটের ভেতর বাতাস ঢুকে যায়, তাহলে মৃতদেহ পচে যাওয়ার আশঙ্কা ছিলো। অতঃপর মৃতদেহ ও বের করা অঙ্গগুলোতে লবণ মেখে শুকানো হতো। যখন সব ভালোভাবে শুকিয়ে যেতো, তখন গামলা গাইন গাছের পদার্থ ও বিভিন্ন প্রকার মসলা মেখে রেখে দেওয়া হতো। চল্লিশ দিন পর লিনেনের কাপড় দ্বারা পুরো শরীর পেঁচিয়ে ফেলা হতো। এরপর তারা মমিগুলোকে সংরক্ষণ করে রাখতো।

সেই মমি করবার লবণকে মরিস বুকাইলির মত ভণ্ড প্রতারক ধর্মব্যবসায়ী সমুদ্রে থাকা বলে দাবী করেছেন, এবং প্রচার করেছেন মমিগুলো সমুদ্রের নীচে ছিল। সত্য হচ্ছে, মিশরের মানুষ তাদের মমি করবার কৌশল ব্যবহার করেই এই মমিগুলো বানিয়েছেন। এখানে আল্লাহর কোন কুদরত ছিল না, বা অলৌকিক উপায়ে আল্লাহর মোজেজায় মৃতদেহগুলো অক্ষত রয়ে যায় নি।

মুহাম্মদ তাহলে এই মমি করবার কথা কীভাবে জানলেন?

মুহাম্মদ মূলত হিব্রু বাইবেল ওরফে ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং আরো কিছু উপকথাকে একত্রিত করে এই আয়াতটি লেখেন। উনার একজন শিক্ষক ছিলেন, ওয়ারাকা ইবনে নওফেল। উনি ছিলেন একাধারে বাইবেল এবং অন্যান্য নানা ধর্মের বিশেষজ্ঞ। উনি আরবিতে প্রথম নিউ টেস্টামেন্ট বাইবেল অনুবাদ করেন বলেও শোনা যায়। এমনকি, উনিই প্রথম বিশেষজ্ঞ যিনি মুহাম্মদকে বলে দেন যে, মুহাম্মদ নবী মনোনীত হয়েছেন। উনার কাছ থেকেই মুহাম্মদ বাইবেল এবং পুরনো নানা ধর্মের গল্পগুলো শুনতেন, তা বুঝতে সমস্যা হয় না। অনেকেই সন্দেহ পোষণ করতেন যে, মুহাম্মদের কাছে আসা নানা আয়াত নাকি আসলে ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের থেকে পাওয়া।

শুধু তাই নয়, মেরাজের যেই গল্প, সেই গল্প অতি প্রাচীন। মুহাম্মদ সেই প্রাচীন উপকথাকে নতুন রূপ দিয়েছিলেন মাত্র। সেটাও নিশ্চিতভাবে নওফেলের কাছ থেকে। তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এক্সোডাসের কাহিনী মুহাম্মদ ওয়ারাকা ইবনে নওফেল থেকেই জেনেছিলেন। এবং একই সাথে, মিশরে যে মমি করে রাখা হতো ফারাওনদের, সেটাও।

তাহলে কোরানের ফেরাউনের গল্প কি সত্য?

ইসলামপন্থীরা জোর গলায় এই দাবীগুলো করে যাচ্ছে যে ফেরাউনের কাহিনী সম্পূর্ণ মিলে গেছে এবং সেটা মরিস বুকাইলি প্রমাণ করেছে। তবে তারা এই দাবী গুলো করে কোন রকমের প্রমাণ এবং তথ্য ছাড়াই। মরিস বুকাইলির দাবী গুলোও পৃথিবীর কোন বিজ্ঞানী মেনে নেয় নি। কিন্তু সত্য হচ্ছে, এগুলো আল্লাহর কুদরতে না, এটা মিশরীয়দের কৌশল। মিশরীয়দের মমি করবার কৌশল জানা থাকবার কারণেই তারা এগুলোর মমি করে রাখতো। এটা ছিল তখনকার সময়ের ধর্মের অংশ। তারা মনে করতো এই রাজারা একদিন আবার জীবিত হবেন। কিন্তু কোরানের যে ফেরাউন সেই ব্যাক্তিই যে পিরামিডের মধ্যে থাকা মমি, তার কোন প্রমাণ কেউ দিতে পারে নি।

তথ্য সুত্রঃ

ফেরাউন বা ফারাওন সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর

ফেরাউনের অক্ষত লাশ ও কোরানের মোজেজা!

কুরআনে ফেরাউনের লাশ সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক বুকাইলিবাদ

4 thoughts on “ফেরাউন নিয়ে মুসলিমদের মিথ্যাচার – ইসলাম ধর্মের ফেরাউন গল্পের সত্যতা কতটুকু ?

  1. Pingback: কুরআনে কতসব আজগুবি কাহিনী বিবৃত হয়েছে যা মুসলিমরা অন্ধ অন্ধভাবে বিশ্বাস করে থাকেন: | সত্যের সন্ধ

Leave a reply to Akkas Ali Cancel reply