শহিদমিনারে ফুল দেয়াকে মূর্তিপূজার সাথে তুলনা

—

3–5 minutes

images (50)

শহিদমিনারে ফুল দেয়াকে মূর্তিপূজার সাথে তুলনা করতে, শেরেক সাব্যস্ত করতে এবং প্রোপাগান্ডা চালিয়ে উঠতি প্রজন্মকে শহিদমিনার থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সারা বছর তৎপর থাকে একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র। অথচ শহিদমিনার একটি ধর্মনিরপেক্ষ ভাস্কর্য। এতে বাঙালিরা ফুল দেন ভাষাশহিদদের প্রতি নিছক শ্রদ্ধা দেখাতে। আজ পর্যন্ত কোথাও শোনা যায়নি— শহিদমিনারের শিক ধরে কেঁদেকেটে কোনো হিন্দু নারী হাত জোড় করে উত্তম স্বামী চেয়েছেন কিংবা কোনো মুসলিম ছাত্রী পরীক্ষায় ভালো ফল পেতে শহিদমিনারে গিয়ে তসবি জঁপেছেন। আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি— রোগমুক্তির জন্য কোনো বৃদ্ধ জাতীয় স্মৃতিসৌধে পাঁঠা বলি দিয়েছেন কিংবা কোনো ধ্বজভঙ্গ পুরুষ দাম্পত্য জীবনে সুখী হবার জন্য অপরাজেয় বাংলায় খাসি মানত করেছেন। শেরেক যদি হয়েই থাকে, তা অহরহ হয়ে চলছে বিবিধ পিরের দরগায়। শহিদমিনারে-ভাস্কর্যে হয় নিছকই সংস্কৃতির চর্চা, অপসংস্কৃতির ধারকদের তাই শহিদমিনারকে এত ভয়।

বিভিন্ন ভাস্কর্যকে মূর্তি বলে প্রচার করে পৈশাচিক আনন্দ পায় প্রতিক্রিয়াশীলেরা। তারা ভালো করেই জানে মূর্তি ও ভাস্কর্যের পার্থক্য। তারাও জানে— ধর্মীয় উদ্দেশ্যে তৈরি প্রাণীপ্রতিকৃতি মূর্তি, আর সর্বজনীন উদ্দেশ্যে তৈরি প্রাণীপ্রতিকৃতি ভাস্কর্য। সৌদি আরব, ইরানের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোতে খোদ মসজিদের পাশেই আছে বিবিধ প্রাণীভাস্কর্য। হজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে মিনায় শয়তানের স্তম্ভে পাথরনিক্ষেপ। শয়তান একটি অদৃশ্য সত্তা, সে নিশ্চয়ই বালবাচ্চা নিয়ে ঐ স্তম্ভে বাস করে না কিংবা ঐ স্তম্ভটিই শয়তান না। তবু শয়তানের ঐ প্রতীকী ভাস্কর্যে পাথরনিক্ষেপকেই ইসলামে ‘শয়তান’কে পাথর নিক্ষেপ করার সমান বলে গণ্য করা হয়, অর্থাৎ ইসলামের অন্যতম রুকন খোদ হজের সাথেও একটি প্রতীকী ভাস্কর্য জড়িত। শয়তানের ঐ ভাস্কর্যটি নিশ্চয়ই মূর্তি নয়, নিশ্চয়ই মূর্তি নয় ইরানে মসজিদের পাশে নির্মিত বিভিন্ন কবির ভাস্কর্যও। তা হলে কেন কেবল বাংলাদেশী ভাস্কর্যগুলোই মূর্তি? কেন শহিদমিনারে ফুল দেয়া মূর্তিপূজা বা শেরেক?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বেশ সহজ। বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষাকে এ দেশের প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বড্ড ভয়। মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও এরা পড়ালেখা করতে পছন্দ করে বরাবরই উর্দু-ফারসি-আরবি ভাষায়। পাকিস্তান আমলে এরা চেয়েছিল বাংলাকে আরবি বর্ণে লিখতে। সেই অপচেষ্টা বিফলে গেলেও শহিদমিনারে ফুল দেয়াকে মূর্তিপূজা বলে কিছু মানুষের মনে ধারণা তৈরি করতে এরা সফল হয়েছে, এরা সফল হয়েছে ধর্মকে ও ধর্মনিরপেক্ষ শহিদমিনারকে মুখোমুখি দাঁড় করাতে। কোনো এলাকায় একটি শহিদমিনার বা মুক্তিযুদ্ধের কোনো ভাস্কর্য নির্মিত হলে তা নিছক ভাস্কর্য থাকে না; অল্পদিনের মধ্যেই সেটি পরিণত হয় একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে, ভাস্কর্যটিকে কেন্দ্র করে সেখানে তৈরি হয় একটি অঘোষিত সাংস্কৃতিক বলয়; সেখানে মঞ্চস্থ হতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের নাটক, ধ্বনিত হতে থাকে রাজাকারবিরোধী কবিতা, পরিবেশিত হতে থাকে তিমিরবিদারী নৃত্য। বাহান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত সংগ্রামে-সমরে বাঙালিকে সবচেয়ে বেশি উদ্দীপ্ত করেছে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটিই। আমরা বাহান্নতে পেয়েছি বাংলা, একাত্তরে পেয়েছি দেশ। শহিদমিনারে না, প্রতিক্রিয়াশীলদের যাবতীয় অ্যালার্জি শহিদমিনারে পরিবেশিত নাটকে-নৃত্যে গানে-কবিতায়। তাই ওরা সমূলে উপড়ে ফেলতে চায় শহিদমিনারের প্রতিটি ইট, প্রতিটি রড!

পাকিস্তান সরকার কেন্দ্রীয় শহিদমিনার ভেঙেছিল দুইবার— ১৯৫২ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি একবার, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে আরেকবার। আলী আকবর টাবীর ‘দৈনিক সংগ্রাম— মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা’ বইটি ওলটাতে-ওলটাতে ৯৫ পৃষ্ঠায় দেখলাম ১৯৭১ সালের ১৬ই জুলাই জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদকীয়তে লেখা আছে— ‘আইয়ুব খানের গভর্নর আজম খান ছাত্রদেরকে খুশি করার জন্য যে শহিদমিনার তৈরি করলেন, তাকে পূজামণ্ডপ বলা যেতে পারে। কিন্তু মিনার কিছুতেই না। সেনাবাহিনী এই কুখ্যাত মিনারটি ধ্বংস করে সেখানে মসজিদ গড়ে শহিদদের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন জেনে দেশবাসী খুশি হয়েছে।’ অর্থাৎ শহিদমিনারের সাথে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ও জামায়াতিদের শত্রুতা বেশ পুরোনো। ভাষা-আন্দোলনের নেতৃত্ব যদি জামায়াতের কেউ দিত; তা হলে শহিদমিনার পূজামণ্ডপও হতো না, শহিদমিনারে ফুল দেয়া শেরেকও হতো না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যেই শুরু হলো, অমনি জামায়াত গোলাম আজমকে ভাষাসৈনিক বলে প্রচার করা শুরু করল। ঘটনাচক্রে একটি মানপত্র পাঠ করে এখন ভাষাসৈনিক-বনে-যাওয়া এই গোলাম আজমই আবার সত্তর সালে প্রকাশ্যে বলেছে ভাষা-আন্দোলন করে সে ভুল করেছে। অর্থাৎ নিক্ষিপ্ত থুতু পুনরায় গলাধঃকরণ করা প্রতিক্রিয়াশীলদের মজ্জাগত স্বভাব। একজন ভাষাসৈনিককেও খুঁজে বের করা যাবে না, যিনি শহিদমিনারে ফুল দেয়াকে শেরেক মনে করেন। শহিদমিনারে ফুল দেয়াকে শেরেক ও শহিদমিনারকে পূজামণ্ডপ মনে করেন বা করতেন বাংলার একমাত্র ছহি ও আসল ‘ভাষাসৈনিক’ গোলাম আজম গং!

বাংলাদেশের যে মাজারটিতে সবচেয়ে বেশি ফুল দেয়া হয় এবং সমর্থকদের মধ্যে যে মাজারটিতে সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষ হয়, সেটি জিয়াউর রহমানের মাজার। জামায়াতিদের মুখে কখনও শোনা যায়নি— জিয়ার মাজারে শেরেক হচ্ছে কিংবা জিয়ার মাজারটি একটি পূজামণ্ডপ। সালাম-বরকতরা ধর্মযুদ্ধে নিহত নন বলে জামায়াতিরা তাদেরকে ‘শহিদ’ বলতে নারাজ। অথচ ধর্মযুদ্ধে নিহত-না-হওয়া জিয়াউর রহমানকে বিএনপি ‘শহিদ রাষ্ট্রপতি’ বলে প্রচার করে চললেও তাতে কখনোই আপত্তি করেনি জামায়াত! শহিদমিনারে ফুল দেয়াকে অনেকেই ‘অর্থের অপচয়’ বলে বলে প্রচার করে। এদের কাছে অবশ্য সবই অর্থের অপচয়; এদের কাছে ফুলও অপচয়, পহেলা বৈশাখের ইলিশও অপচয়। সে দিন দূরে না, যেদিন এরা ইলিশকেও মুরতাদ মাছ বলে ঘোষণা করবে, ইলিশ খাওয়াকে হারাম ও শেরেক বলে ফতোয়া দেবে!

এক শহিদমিনারের যে পরিমাণ রেপ্লিকা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে আছে, তা পৃথিবীর আর কোনো ভাস্কর্যের নেই। বাঙালি জাতি অন্য কোথাও ঐক্যবদ্ধ না হলেও অন্তত শহিদমিনারে ও ভাষার প্রশ্নে এক ও ঐক্যবদ্ধ। বাঙালির এই ঐক্যের জায়গাটিতে ফাটল ধরাতেই শেরেকতত্ত্ব নিয়ে ৬৪ বছর ধরে ছটফট করছে বাঙালি জাতিরই একটি বেওয়ারিশ অংশ।

৮ মার্চ ২০১৬
বই : লক্ষ্য আমার পক্ষ নেওয়া।

-আখতারুজ্জামান আজাদ।

Leave a Reply

Discover more from সত্যের সন্ধানী

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading