আজকাল মুমিনরা কথায় কথায় প্যারাডক্সিকাল সাজিদের রেফারেন্স দেয়। এমন একটা ভাব যে আরিফ আজাদ সাহেব বিজ্ঞানীদের থেকেও বড় বিজ্ঞানী। তো আগ্রহ নিয়েই বই দুটো পড়া শুরু করেছিলাম এবং বই দুটি পড়ে আমি যার পর নাই হতাশ হলাম ।
যারা খুব সহজ সরল এবং যুক্তি বোঝেনা তাদের কাছে বই দুটা আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। বই দুটো খুবই সহজ পাঠ্য এবং সাবলীল ভাবে লেখা। কিন্তু অভিজ্ঞ পাঠকরা এর লজিকাল ফ্যালাসি গুলো খুব সহজেই ধরতে পারবেন।
আমি বই দুইটার পি ডি এফ ডাউনলোড করার জন্য নিচে লিংক দিয়েছি। প্রথম লিঙ্কটা প্যারাডক্সিকাল সাজিদ -১ এবং পরের টা প্যারাডক্সিকাল সাজিদ -২ ফ্রি ডাউনলোড লিংক। ডাউনলোড করে নিজেরাই পড়ে নিন।
এই বই দুটা লেখার পিছনে আরিফ আজাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল নাস্তিকদের আর্গুমেন্ট গুলোর উত্তর দেওয়া সাজিদের সাথে প্রশ্নে উত্তরের মাধ্যমে, এবং ইসলামের মাহাত্ম্য প্রকাশ করা। এখানে সাজিদ চরিত্র টি লেখকের বন্ধু নাস্তিক এবং “আমি” চরিত্র টি লেখক নিজে। প্রথমেই বলে রাখি যে লেখক যেহেতু একজন আস্তিক, এবং নিজেই সাজিদ চরিত্রটি তৈরি করে নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, তাই আর্গুমেন্ট গুলো শুরু থেকেই একপেশে এবং দুর্বল। যেহেতু অন্য পাশের কোন শক্তিশালী যুক্তি নেই, তাই এটা অনেকটা Straw Man Fallacy হয়ে গেছে।
আমি প্রথম থেকেই তার আর্গুমেন্টের ভুল গুলো তুলে ধরছি ।
পর্ব – ১ বিশ্বাসীর বিশ্বাস ঃ
এখানে সাজিদ যে প্রশ্ন টি জিজ্ঞাসা করেছে যে – “আচ্ছা তোরা স্রষ্টাকে বিশ্বাস করিস কিসের ভিত্তিতে?” এটা খুবই ন্যায্য প্রশ্ন এবং উত্তর একটাই, অন্ধ বিশ্বাস। যেটাকে ইংলিশে বলে Faith আর আরবিতে বলে ঈমান। অর্থাৎ কোন যুক্তি প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বাস করা ।
প্রতিটি মুসলমানকেই ছোট বেলা থেকে শেখানো হয়েছে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্, আর পরকালে তাদের বিচার হবে । এটা একটা অন্ধ বিশ্বাস মাত্র।
অতি-প্রাকৃতিক কোন কিছুই প্রমাণিত নয় আর তাই মুসলমানরা আল্লাহ্ এবং পরকালে বিশ্বাস করে অন্ধ ভাবেই। আমাদের দেশে এমন মানুষ খুব কমই আছে যারা যুক্তি দিয়ে, যাচাই বাছাই করে তার পর মুসলমান হয়েছে।
এই পর্বে আরিফ আজাদ সাহেব দু ধরনের বিশ্বাসের সংজ্ঞা দিয়েছেন। একটা হল প্রমাণ ছাড়া আরেকটা হল প্রমাণ সহ। কিন্তু প্রমাণ থাকলেতো আর আপনার অন্ধ ভাবে বিশ্বাস করার প্রয়োজন হয় না। তখন সেটা হয় আস্থা বা সম্ভাব্য সত্য হিসাবে বিশ্বাস করা।
বিশ্বাসর মানে যদি ধারণা করা বা Belief হয়, বা আস্থা রাখা বা Trust হয় তাহলে আমরা অনেক কিছুই বিশ্বাস করতে পারি। এই ব্যাপার গুলো হবে এমন, যেসব জিনিষ সত্য হতে পারে বা যেগুলোর উপর আমাদের আস্থা আছে। যেমন আমরা আমাদের বন্ধুদের বিশ্বাস করি বা কোন আর্টিকেল পড়ে আমরা একটা ধারণা করতে পারি বা কিছুটা আস্থা বা বিশ্বাস করতে পারি। তবে দেখতে হবে আমাদের তথ্য গুলো যেখান থেকে এসেছে, সেগুলো কতটা বিশ্বাসযোগ্য। আমরা বিজ্ঞানীদের কোন মতবাদকে বা কোন ফিলসফির উপর বিশ্বাস করতে পারি, যেটা আমাদের কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয় । তবে সেটা হতে হবে উপযুক্ত যুক্তি, তথ্য এবং প্রমাণের উপর ভিত্তি করে।
ঈমান বা অন্ধ বিশ্বাস কি ভালো জিনিস?
এবার আসি অন্ধ বিশ্বাস কি একটা ভালো জিনিস? আপনি যদি যে কোন জিনিষ, কোন কারণ ছাড়াই, এবং সত্য মিথ্যা যাচাই না করেই, অন্ধ ভাবে বিশ্বাস করতে পারেন, বা ঈমান আনতে পারেন, তো এই ঈমান বা অন্ধ বিশ্বাস একটা ভালো জিনিষ হয় কিভাবে? আপনি তো পৃথিবীর অন্য কোন বিষয়ে এই একই যুক্তি প্রয়োগ করেন না, যেটা আপনার ধর্মের বেলায় আপনি প্রয়োগ করেন?
এখানে আরিফ আজাদ সাহেব যে পয়েন্ট টা এনেছেন সেটা হল প্রমাণের ভিত্তিতে যে বিশ্বাস, সেটা কোন বিশ্বাসের মধ্যে পড়েনা। যে কোন আস্তিকই এই যুক্তি দেবে। যে বিজ্ঞানের বিশ্বাসের উপর ভরসা করা যায় না। বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত ক্ষণে ক্ষণে পাল্টায়। আজ যেটা সত্য বলছে, কাল সেটা মিথ্যা হয়ে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তাদের কাছে এই দুর্বোধ্য কিতাবটাই চরম সত্য।
আরিফ আজাদের এই যুক্তিতে মুমিনরা অন্ধের মতো বলতে থাকে বিজ্ঞান মানিনা এবং এটা তারা বলে তাদের মুঠো ফোন হাতে নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে দিতে। এটা যে কতোটা ক্ষতিকর যুক্তি তা একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়।
মানুষের সভ্যতা প্রতি নিয়তই পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের রুচি এবং সভ্যতার মাপকাঠি। সেক্ষেত্রে ১৪০০ বছর আগে লেখা ধ্যান ধারনা নিয়ে পড়ে থাকলে মানুষকে পিছিয়েই পড়তে হবে ।
বিজ্ঞানের ভিত্তি বনাম বিশ্বাসের ভিত্তি
আসলে আমাদের দেখতে হবে যে আমরা যে তথ্য গুলো পাচ্ছি, সেটা কিসের ভিত্তিতে পাচ্ছি? বিজ্ঞানের তথ্য গুলো আসে পরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। আমাদের প্রযুক্তি যত উন্নত হয় তত আমরা নির্ভুল তথ্য উপাত্ত পাই এবং আমাদের আগের সিদ্ধান্ত গুলো পরিবর্তন হতে থাকে। এর মানে এই না যে আমারা এক এক দিন এক এক কথা বলছি। বিজ্ঞান আসলে একটা পদ্ধতি যেটা প্রতিদিন আপডেট হয়। কিন্তু ধর্মের ভিত্তি হল ফেরেস্তা, যেটা সম্পূর্ণ অন্ধ বিশ্বসের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, এবং এগুলো আপডেট হয় না। এগুলোর শুধু ব্যাখ্যা পরিবর্তন হতে পারে, এবং এক এক জনের কাছে একই জিনিষের ব্যাখ্যাও এক এক রকম হতে পারে।
এর মধ্যে তিনি এই যুক্তি টাই এনেছেন যে আগে নাকি সব বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতো যে পৃথিবী স্থির সূর্য ঘোরে, কিন্তু পরে আবার প্রমাণিত হল যে সূর্য নয় পৃথিবী ঘোরে। এখানে উনি টলেমী, কপার নিকাস, ইত্যাদি গ্রিক বিজ্ঞানীদের কথা এনেছেন।
ধরে নিলাম বিজ্ঞানীরা মাঝে মাঝে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। কিন্তু তাই বলে কি আমরা বিজ্ঞানকে অস্বীকার করতে পারি? আমাদের কাছে বিজ্ঞান ছাড়া আর কি কোন উপায় আছে যা দিয়ে আমরা সত্য জানতে পারি?
উপরেই উল্লেখ করেছি যে অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে মানুষ যে কোন জিনিষ মেনে নিতে পারে। তাহলে যুক্তি ছাড়া, অন্ধ বিশ্বাস কিভাবে সঠিক সিদ্ধান্তে আসার সঠিক পদ্ধতি হতে পারে?
বিজ্ঞান নিজেই নিজেকে শুধরে নেয়
আমরা বিজ্ঞানের পদ্ধতি ফলো করে যে সিদ্ধান্তে আসতে পারি, সেটাই আমাদের কাছে ঐ সময়ের জন্য সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত হয়। এবং সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমরা আমাদের ভুল বুঝতে পারি বিজ্ঞান কে মেনে নিয়েই । বিজ্ঞান এমন একটা পদ্ধতি যেটা নিজেই নিজের ভুল গুলো শুধরে নেয়।
যা দেখিনা তা মানিনা এবং বিজ্ঞান কি ন্যায় অন্যায় বুঝতে পারে?
এর পর আরিফ সাহেব কিছু জঘন্য এবং দুর্বল যুক্তি এনেছেন যেমন নাস্তিকরা নাকি কিছু না দেখে বিশ্বাস করেনা। ধর্ষণ করলে কেন শাস্তি হবে? এবং আপনার মা বাবার মিলনের ফলে যে আপনার জন্ম হয়েছে এটা কি আপনি দেখেছেন? এগুলো নিতান্তই সস্তা এবং পুরানো যুক্তি যা বহু বার রিফিউট করা হয়েছে। কিন্তু মুমিনরা বার বার এই যুক্তি গুলোই নিয়ে আসে।
আমরা অবশ্যই না দেখে অনেক কিছু বিশ্বাস করি, কিন্তু সেগুলো অন্ধ বিশ্বাস নয়, যুক্তি প্রমাণের ভিত্তিতে। আমারা অপরাধ গুলো এবং মানবিক দিক গুলোও বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণ করতে পারি। ন্যায় অন্যায়, মরালীটি, এবং ভালো খারাপ সব কিছুই বিজ্ঞান দিয়ে নির্ণয় করা সম্ভব।
অন্ধ বিশ্বাস কখনোই মানব সভ্যতার জন্য কল্যাণকর নয়। বিজ্ঞান আমাদের সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত দেয় না ঠিক ই, কিন্তু বিজ্ঞান ছাড়া আমাদের আর অন্য কোন পদ্ধতিও তো নেই যেটা আমাদের সত্য এবং সঠিক ফল দিবে। বিজ্ঞানের ভিত্তি পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং এনালিসিসের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া । আর ধর্মের মূল ভিত্তি হল নবীর বানী, ফেরেস্তা, আর আসমানি কিতাবের উপর ভিত্তি করে অন্ধ বিশ্বস । এটা অন্ধ ভাবে সত্য বলে মেনে নিতে হবে । কিন্তু আমরা যদি অন্ধ ভাবে মেনে নেই, তাহলে আমরা কোনদিন ও আমাদের সিদ্ধান্তের পিছনে সঠিক যুক্তিটা খুঁজে পাবো না । কারণ ঈমান মানেই অন্ধ ভাবে মেনে নেওয়া।

