সংক্ষিপ্ত ভূমিকা
বাংলা সমাজে নাস্তিকতা নিয়ে প্রচলিত ধ্যান-ধারণাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো — “নাস্তিকরা মানসিকভাবে দুর্বল বা ‘সোসাল এনজাইটি’–এর মতো রোগে আক্রান্ত।” কিন্তু বাস্তবতা জটিল এবং বহুস্তরীয়। বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত জগতে যে অনেকে ঈশ্বর-অবিশ্বাসী (atheist) বা অজ্ঞেয়বাদী (agnostic), তা কেবল ব্যক্তিগত ধর্মানুভব নয়—তার পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ। নিচে এই বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো। Pew Charitable Trust
উল্লেখযোগ্য নাস্তিক ও অজ্ঞেয়বাদী বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের তালিকা
🔬 জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসা

- রিচার্ড ডকিন্স – বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী, The God Delusion গ্রন্থের লেখক, স্পষ্ট নাস্তিক।
- ফ্রান্সিস ক্রিক – ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কারক, প্রকাশ্যে নাস্তিক।
- জেমস ডি. ওয়াটসন – ডিএনএ আবিষ্কারে ক্রিকের সহ-আবিষ্কারক, নিজেকে নাস্তিক বলে পরিচিত।
- জে. বি. এস. হ্যালডেন – বিখ্যাত জেনেটিসিস্ট, মার্ক্সবাদী ও নাস্তিক।
- অ্যান্ড্রু ফায়ার – নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, আরএনএ ইন্টারফারেন্স আবিষ্কারক, নাস্তিক।
⚛️ পদার্থবিজ্ঞান

- স্টিভেন ওয়াইনবার্গ – নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ, স্পষ্টভাষী নাস্তিক।
- লিওন লেডারম্যান – নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ, নাস্তিক; “God Particle” শব্দটি রসিকতার ছলে ব্যবহার করেন।
- পল ডিরাক – নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ, বিখ্যাত নাস্তিক।
- রিচার্ড ফেইনম্যান – নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ, নিজেকে ঈশ্বরে অবিশ্বাসী বলে মানতেন।
- লরেন্স ক্রাউস – তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, নাস্তিকতার পক্ষে বহু বই লিখেছেন।
🌌 জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশবিজ্ঞান
- কার্ল সেগান – বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী, নিজেকে মূলত agnostic বললেও ঈশ্বরে অবিশ্বাসী।
- নিল ডি গ্রাস টাইসন – জ্যোতির্বিজ্ঞানী, প্রকাশ্যে agnostic/atheist leaning।
- ভিক্টর স্টেনজার – পদার্থবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী, God: The Failed Hypothesis গ্রন্থের লেখক।
📐 গণিত ও দর্শন
- বারট্রান্ড রাসেল – দার্শনিক, গণিতবিদ ও সমাজকর্মী, স্পষ্ট নাস্তিক।
- জঁ-পল সার্ত্র – অস্তিত্ববাদী দার্শনিক, অল্প বয়স থেকেই নাস্তিক।
💻 প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন

- লিনুস টরভাল্ডস – লিনাক্সের স্রষ্টা, প্রকাশ্যে নাস্তিক।
- বিল গেটস – মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা, নিজেকে agnostic বলেছেন।
- মার্ক জাকারবার্গ – ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা, একসময় নাস্তিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
- স্টিভ ওজনিয়াক – অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, নিজেকে নাস্তিক বলেছেন।
- ইলন মাস্ক – ঈশ্বরে প্রচলিত বিশ্বাস অস্বীকার করেন, agnostic/atheist leaning।
১) পরিসংখ্যান: বিজ্ঞানীরা কতটা ধর্মনিরপেক্ষ?
একটি উল্লেখযোগ্য সমীক্ষা দেখায়, বিজ্ঞানীরা সাধারণ জনমানুষের তুলনায় ধর্মবিশ্বাসে বহুাংশে কম সক্রিয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৯ সালের পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা গেছে—বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে ঈশ্বর বা উচ্চতর শক্তিতে বিশ্বাসকারী অংশ সাধারণ জনগণের তুলনায় কম (scientists are roughly half as likely as the general public to believe in God or a higher power)। এই ধরনের ফলাফল বলছে—বিজ্ঞানী জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাসের মানচিত্র জনসাধারণের তুলনায় আলাদা। Pew Charitable Trusts
২) কেন বিজ্ঞানীদের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবণতা বেশি দেখা যায়? — কিছু কারণ
নীচে কয়েকটি মনস্তাত্ত্বিক, শৈক্ষিক ও সাংস্কৃতিক কারণ বিশ্লেষণ করা হলো:
ক) ভাবনার পদ্ধতি: বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা (analytic thinking)
সত্য-সম্ভাবনা ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে যাঁরা চিন্তা করেন, তাঁদের মধ্যে ঈশ্বর-অবিশ্বাসী হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়—কিছু গবেষণা দেখায় বিশ্লেষণাত্মক বা অনুধাবনী রেশনের সক্রিয়তা ধর্মবিশ্বাসকে কমাতে পারে। অর্থাৎ, যেসব মানুষের আচরণগত বা শ্রুতিমাধ্য ভাবনার প্রবণতা বেশি—তারা অতিচট করে অজ্ঞেয়বাদী/নাস্তিক অবস্থান গ্রহণ করতে পারেন। (এই কারণটি একমাত্র নয়; সামাজিক ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ)। PubMed

খ) পেশাগত প্রাকটিস: প্রমাণ ও পরীক্ষার জোর
বিজ্ঞানীর কাজের মৌলিক উপাদান হলো কোয়ান্টিফায়েবল প্রমাণ, পুনরাবৃত্তিযোগ্য পরীক্ষা, এবং ভুল প্রমাণ করলে সংশোধনের সাংস্কৃতিক অভ্যাস। যখন জ্ঞানচর্চার প্রধান মানদণ্ড হয় প্রমাণ এবং তত্ত্ব–পরীক্ষা, তখন অতিপ্রাকৃত/অভিজ্ঞতাসূত্রে গড়ে ওঠা ব্যাখ্যা প্রাকৃতিক ব্যাখ্যার জায়গা নেনা—এটি অনেককে অস্থির করে না বরং বিকল্প ব্যাখ্যার খোঁজে নেয়। (এই দিকটি একধরনের শৈক্ষিক ও পেশাগত ‘প্রশিক্ষণগত’ কারণ)।
গ) ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
আধুনিক বিজ্ঞানের পেছনে ইউরোপিয়ান ঔপনিবেশিকতা, উজ্জ্বল যুগ (Enlightenment), এবং ১৮–১৯ শতকের পেশাগতীকরণ—এসব প্রক্রিয়া ধর্মীয় ব্যাখ্যা থেকে স্বতন্ত্রভাবে প্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করেছে। ফলে আধুনিক বিজ্ঞানী–সম্প্রদায় ধীরে ধীরে ধর্মনিরপেক্ষ বা অজ্ঞেয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অনুকূল হয়। (এই ইতিহাস-তাত্ত্বিক বিষয়টি বিস্তারে অধ্যয়নযোগ্য কিন্তু সহজভাবেই বলা যায়—বিজ্ঞান ও ধর্মের সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত ভাবনা নয়, সাংস্কৃতিক কাঠামোতেও আবদ্ধ)।
৩) ব্যক্তিজীবন বনাম আদর্শবাদ — খণ্ডিত কৌশল

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: নাস্তিকতা মানেই ‘ধর্মবিরোধী’ নাও হতে পারে। অনেক বিজ্ঞানী নিজেদেরকে দর্শনগতভাবে অগনি বা অজ্ঞেয়বাদী বলে নেন; কেউ কেউ সক্রিয়ভাবে ধর্মবিরোধী (militant atheism) হন। Stephen Jay Gould-এর Non-Overlapping Magisteria (NOMA) ধারণা অনুযায়ী বিজ্ঞান ও ধর্ম দুটি ভিন্ন ‘শাসনক্ষেত্র’—একটি সত্য-তথ্য নির্ণয়ে, অন্যটি মান, নৈতিকতা ও অর্থ নির্ধারণে—এটি অনেক বিজ্ঞানীর মধ্যেকেই সান্ত্বনার জায়গা তৈরি করে এবং কম সংঘাত ঘটায়। joelvelasco.net
৪) “নাস্তিক = মানসিক রোগ/সামাজিক অনৈক্য” — এই ধারণার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন
পাবলিক কথ্যধারণায় নাস্তিকদের নিয়ে নেতিবাচক স্টিরিওটাইপ আছে—বিশেষ করে কিছু ধর্মভিত্তিক আলোচনায় নাস্তিকতাকে মানসিক অস্বস্তি বা রোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে আধুনিক মনঃচিকিৎসা ও সমাজবিজ্ঞানের ফলাফলগুলো এমন সরল সমীকরণকে সমর্থন করে না:
- ধর্ম/আধ্যাত্মিকতা এবং মানসিক সুস্থতা নিয়ে ব্যাপক সমীক্ষা ও রিভিউ সংঘটিত হয়েছে; সামগ্রিক প্রমাণ বলে যে ধর্মীয় পরিকল্পনা ও সামাজিক সমর্থন অনেক সময় মানসিক সুস্থতায় সহায়ক, কিন্তু এটি নাস্তিকদের জন্য অপরিহার্য সুবিধা নয়—অনেক নাস্তিক/নন-ধর্মীয় ব্যক্তি সামাজিক নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, এবং মানসিক যত্নের মাধ্যমে সমতুল্য বা ভালো মানসিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে পারে। PubMed
- কিছু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কাগজপত্রে নাস্তিকদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক লক্ষণ (anxiety, paranoia ইত্যাদি) কমে দেখানো হয়েছে—অর্থাৎ “নাস্তিক = বেশি সামাজিক উদ্বিগ্ন” এই দাবির পক্ষে সুনির্দিষ্ট একরৈখিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই; পার্থক্যগুলো প্রাতিষ্ঠানিক পটভূমি, বয়স, সামাজিক সংহতি ও অন্যান্য ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভরশীল। PubMed
- তদুপরি, নন-ধর্মীয়/নাস্তিক উপসর্গের লোকেরা অনেক জায়গায় ম্যানোরিটি স্ট্রেস (অল্পসংখ্যক হিসেবে বৈষম্য বা বিচ্ছিন্নতা) সম্মুখীন হন—যা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে; কিন্তু এটাও প্রমাণ করে যে সমস্যা ধরনটি ধর্মবিশ্বাসে নয়—বরং সমাজগত বৈষম্য ও বিচ্ছিন্নতায়। (অর্থাৎ সমস্যা ‘নাস্তিকতা’ নয়; সমস্যা হলো সামাজিক ভিন্নমতের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া)। American Psychological Association
সিদ্ধান্ত: নাস্তিকতা নিজে কোনো মনস্তাত্ত্বিক রোগ নয়; নাস্তিকদের অপরিহার্যভাবে ‘সামাজিক নিঃসঙ্গতা’ বা ‘সামাজিক উদ্বেগ’ থাকে—এমন সমগ্রকথা বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়। বরং ভিন্ন মূল্যবোধ ও সামাজিক অবকাঠামোই প্রভাব ফেলে। PubMedAmerican Psychological Association
৫) উদাহরণ: নামকরা বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের ভূমিকা

বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তিতে অগ্রণী অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ বা নাস্তিক—তাদের অবদান দেখলে বোঝা যায় যে নাস্তিকতা কার্যক্ষমতা বা নৈতিক কৃত্যাবলীর বাধা নয়। এদের কাজের ধরণ, নৈতিক বিতর্ক ও সামাজিক প্রভাব আলাদা আলোচ্য। (বিশেষত: বিবর্তনবাদ, জিন-প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিতর্ক হয়েছে—কিন্তু সেগুলো প্রোফেশনাল ও তাত্ত্বিক আলোচনা।) [উপরের পরিসংখ্যানগত/গবেষণামূলক পটভূমি এখানে প্রাসঙ্গিক।] Pew Charitable Trusts
৬) সামাজিক পরিণতি: কি করা উচিত?
- স্টিগমা কমানো: নাস্তিকতা–সম্পর্কিত নেতিবাচক স্টিরিওটাইপ (যেমন: মানসিক রোগভোগী) বন্ধ করা দরকার—এটি যুক্তিবিচ্ছিন্ন ও ক্ষতিকর। গবেষণা বলছে—মানসিক স্বাস্থ্যের পার্থক্যগুলো সামাজিক সহায়তা ও বৈষম্যের ওপর নির্ভর করে, ধর্মবিশ্বাসের ওপর নয়। PubMedAmerican Psychological Association
- সহিষ্ণুতা ও বিবিধতা: বৈজ্ঞানিক সমাজে যেমন ভিন্ন মত থাকে (তাত্ত্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা), সমাজেও মতের প্লুরালিস্ট কাঠামো গড়ে তোলা উচিত—এতে আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতা বাড়ে।
- শিক্ষা ও উপস্থিতি: বিজ্ঞান ও দর্শন বিষয়ের সুশিক্ষা দিলে ‘অজ্ঞাতবোধ’ কমে ও ভিন্নবাদী ব্যাখ্যার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হয়।
- নিতান্ত সামাজিক নীতিনির্ধারণে বৈজ্ঞানিক অবদান: ধর্ম বা ধার্মিকতা থাকুক বা না থাকুক—সমাজ চালাতে নৈতিক নীতি, সামাজিক নেটওয়ার্ক, আইনি কাঠামো ও ন্যায্যতা জরুরি। উদাহরণ: নরডিক দেশগুলোতে উচ্চ সামাজিক বিশ্বাস ও কল্যাণ ব্যবস্থা থাকায় সেগুলো সেকুলার হলেও শক্ত সামাজিক বন্ধন এবং সার্বিক সুখের সূচকে উপরে রয়েছে। World Happiness Report
উপসংহার
বিজ্ঞানী বা প্রযুক্তিবিদের মধ্যে নাস্তিকতার উচ্চতার পেছনে শুধুমাত্র একক কারণ নেই—এটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত, পেশাগত প্রশিক্ষণ, চিন্তার ধরন এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাবের সম্মিলিত ফল। “নাস্তিক = মানসিক রোগ” এই ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়; বরং সমস্যাটি সমাজের পক্ষপাত, অসামঞ্জস্য এবং তথ্য-বৈষম্যের সঙ্গে জড়িত। তাই ক্ষমাশীল, তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও জনগণের শিক্ষা বাড়ানোই হল সবচেয়ে কার্যকর রাস্তাটি।
