
১. পদার্থের “ধর্ম” বনাম প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম
আপনি খুব সঠিকভাবে আলাদা করেছেন যে “আগুনের ধর্ম” বা “জলের ধর্ম” বলতে বোঝানো হয় তাদের স্বভাব বা বৈশিষ্ট্য — যেমন আগুন পোড়ায়, জল ভিজায়। এই ব্যবহারটি ভাষাগত ও বৈজ্ঞানিক, ধর্মতাত্ত্বিক নয়।
কিন্তু আমরা যখন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নিয়ে কথা বলি — যেমন ইসলাম, খ্রিষ্টান ধর্ম, হিন্দু ধর্ম — তখন বিষয়টি হয়:
- একটি বিশ্বাস ব্যবস্থা (বিশেষত ঈশ্বর বা অতিপ্রাকৃত সত্ত্বায় বিশ্বাস),
- নীতিনৈতিক কাঠামো (হালাল-হারাম, পাপ-পুণ্য),
- আচার-অনুষ্ঠান (নামাজ, পূজা, যাজকীয় আচরণ),
- এবং একটি সংগঠিত সামাজিক কাঠামো।
২. নাস্তিকতা শুধুই ঈশ্বরে অবিশ্বাস
আপনি একদম ঠিক বলেছেন—নাস্তিকতা নিজে কোনো ধর্ম নয়। নাস্তিকতা হলো একপ্রকার বিশ্বাসহীনতা (বিশেষ করে ঈশ্বর বা অতিপ্রাকৃত সত্তায় অবিশ্বাস)।
নাস্তিকতা:
- কোনো নির্ধারিত আচরণবিধি বা আচার-অনুষ্ঠান অনুসরণ করে না,
- কোনো পবিত্র গ্রন্থ বা নৈতিক নির্দেশাবলি দিয়ে পরিচালিত হয় না,
- এবং নিজেই কোনো “ধর্ম” নয়, বরং অনেক সময় ধর্মের প্রতিপক্ষ।
৩. “যা ধারণ করা হয় তাই ধর্ম” — এই বক্তব্যের অসঙ্গতি
এই বক্তব্যটি একটি বিভ্রান্তিকর সাধারণীকরণ। “ধর্ম” শব্দটি সংস্কৃত “ধৃ” ধাতু থেকে এসেছে, যার মানে “ধারণ করা”। তবে ভাষাগত উৎপত্তি দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের কাঠামো নির্ধারণ করা যায় না।
আপনি যথার্থভাবে বিদ্রুপ করে বলেছেন — “তাহলে আমি মাউস ধর্ম পালন করি”, কারণ আমি মাউস ধারণ করি। এটা দেখায় যে “ধারণ করাই ধর্ম” বলাটা অযৌক্তিক — কারণ সবাই তো প্রতিদিন হাজারো কিছু ধারণ করে, তা নিয়ে ধর্ম হয় না।
৪. মানুষের ধর্ম যদি হয় মনুষ্যত্ব, তাহলে…?
এখানে আপনার বক্তব্যটি মূলত একটি মানবিক নৈতিকতা-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি:
“মানুষের প্রকৃত ধর্ম মনুষ্যত্ব।”
এটি একটি জনপ্রিয় নীতিগত উক্তি — বিশেষত যারা ধর্মের নামে বৈষম্য বা হিংসা দেখে তারা বলেন “সবার উপরে মানুষ সত্য”। কিন্তু এই দৃষ্টিকোণও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সংজ্ঞার বাইরে, কারণ এখানে কোনো ঈশ্বর, আচার-অনুষ্ঠান বা বিশ্বাস কাঠামো নেই।
উপসংহার: নাস্তিকতা কি ধর্ম?
আগুনের ধর্ম কি? জলের ধর্ম কি? এসব নিয়ে আমরা আলাপ করছি না। আমরা Organized Religion বা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নিয়ে কথা বলছি। পদার্থের ধর্ম হচ্ছে পদার্থের ভৌত অথবা রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য । কিন্তু আমাদের আলোচ্য বিষয় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম। যেগুলার একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা আছে, আচার অনুষ্ঠান আছে, একটি অতি প্রাকৃতিক সত্ত্বা আছে। এগুলির কোনটিই নাস্তিকতার মধ্যে নাই। নাস্তিকতা শুধুমাত্র ঈশ্বর বিশ্বাসের অবস্থান।
আবার অনেকে বলছে যা ধারন করা হয় তাই ধর্ম । সে ক্ষেত্রে আপনি শুধু ইসলাম ধারন করেন নাকি পালন করেন? ধারন করলেই যদি ধর্ম হয় তাহলে আমি মোবাইল ধর্ম পালন করি।
![]()
বৈশিষ্ট্য যদি ধর্ম হয় তাহলে মানুষের ধর্ম হচ্ছে মনুষ্যত্ব ।![]()
![]()
ধর্ম কি, আর নাস্তিকতা কী? একটু ভেবে দেখি…![]()
————————————————————–
আগুনের ধর্ম পোড়ানো, জলের ধর্ম ভেজানো — এসব নিয়ে আমরা বলছি না। এগুলো পদার্থের বৈশিষ্ট্য।
আমরা কথা বলছি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নিয়ে —
যার রয়েছে:
ঈশ্বর বা অতিপ্রাকৃত সত্তায় বিশ্বাস
নির্দিষ্ট আচরণবিধি ও নীতিমালা
আচার-অনুষ্ঠান ও রীতি
এবার আসি নাস্তিকতার কথায় —
নাস্তিকতা কোনো ধর্ম নয়। নাস্তিকতা হলো ঈশ্বরে অবিশ্বাস। এতে কোনো ঈশ্বর নেই, আচার নেই, গীতা-বাইবেল-কোরান নেই। আর কেউ কেউ বলে — “যা ধারণ করি, তাই ধর্ম”। তাহলে তো আমি “মাউস ধর্ম” পালন করি, “মোবাইল ধর্ম” পালন করি!
ধারণ মানেই যদি ধর্ম হয়, তবে এটা তো হাস্যকর অবস্থায় পৌঁছে যায়। মানুষ যদি বলে তার ধর্ম “মনুষ্যত্ব” — তাহলে সেটা হয় একটি নৈতিক অবস্থান, ধর্ম নয়। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম মানেই একটি বিশ্বাস কাঠামো, আচার-অনুষ্ঠান, ঈশ্বর — এগুলোর সম্মিলন।
ধর্ম নিয়ে চিন্তা করুন, প্রশ্ন করুন। কারণ প্রশ্ন থেকেই মুক্তির সূচনা হয়।
#ধর্ম#নাস্তিকতা#ভাবনা#বিতর্ক#বিশ্বাস_নয়_বুঝে_ধরুন
- আমরা ধর্ম বলতে বিজ্ঞান বা সাধারণ ধারণার ধর্ম নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বুঝি।
- নাস্তিকতা ধর্ম নয়।
- “যা ধারণ করা হয় তাই ধর্ম” বললে বিষয়টি হাস্যকর হয়।
- মনুষ্যত্ব ধর্ম হতে পারে, তবে সেটা ব্যক্তিগত নৈতিকতার ব্যাপার, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নয়।
