
পহেলা বৈশাখ— বাঙালির প্রাণের উৎসব। এ দিনটিকে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয় পুরো বাংলাদেশজুড়ে। রঙিন পোশাক, মঙ্গল শোভাযাত্রা, গান-বাজনা, আর ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন মিলেই বাঙালির নববর্ষ উদযাপন। আর এই খাবারের তালিকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একেবারে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে পান্তা-ইলিশ। কিন্তু এই পান্তা-ইলিশ কি আদিকাল থেকেই পহেলা বৈশাখের অংশ ছিল? না কি এটি আধুনিক যুগে তৈরি হওয়া এক নতুন রীতি?
প্রাচীন পান্তার চর্চা
ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত মনসামঙ্গল কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি বিজয়গুপ্ত লিখেছেন:
“আনিয়া মানের পাত বাড়ি দিল পান্তাভাত।”
এখানে ‘মান’ বলতে বোঝানো হয়েছে মানকচুর পাতা, যা দিয়ে পান্তা পরিবেশন করা হতো। পান্তার সঙ্গে তখন সহজলভ্য দেশি মাছ যেমন পুঁটি, কৈ, টাকি কিংবা ট্যাংরা খাওয়ার প্রচলন ছিল। ইলিশ মাছ তখন পান্তার সঙ্গী ছিল না।
পান্তা-ইলিশের সূচনা
পান্তা-ইলিশ প্রথম জনপ্রিয় হয় ১৯৮০/৮১ সালের পহেলা বৈশাখে। জানা যায়, সাংবাদিক বোরহানউদ্দিন আহমেদ প্রথম এই খাবারকে কেন্দ্র করে নববর্ষ উদযাপনের প্রস্তাব দেন। বন্ধুবান্ধব মিলে চাঁদা তুলে আয়োজন করা হয় পান্তা-ইলিশের। পরের বছর পরিচালক শহিদুল হক খান রমনায় এ আয়োজন করেন এবং পোস্টার এঁকে সেটিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন।
জনপ্রিয়তা ও বিকাশ
আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের অনুষ্ঠানের পাশেই জমে ওঠে পান্তা-ইলিশ বিক্রির আয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ব্যবসায়িক চিন্তায় পান্তা-ইলিশ বিক্রি শুরু করেন। তখন থেকে এটি একটি ট্রেন্ডে পরিণত হয়। মাটির সানকিতে পরিবেশিত পান্তা-ইলিশ, সাথে আলু ভর্তা, পোড়া বেগুন— এগুলোতে যোগ হয়েছিল উৎসবের ছোঁয়া। নব্বইয়ের দশকে এটি রীতিমতো জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
বাধ্যতামূলক নাকি রুচির বিষয়?
পান্তা-ইলিশ খাওয়া এখন একটি প্রচলিত রীতি হলেও, এটি কখনোই বাধ্যতামূলক সংস্কৃতি নয়। অনেকেই একে দেখেন বাঙালিয়ানার প্রতীক হিসেবে, আবার কেউ কেউ মনে করেন এটি একটি আরোপিত আধুনিক রীতি। ঐতিহ্য অনুযায়ী বর্ষবরণে চিড়া-মুড়ি, গুড়-নারিকেলের চর্চাও ছিল প্রচলিত।
🐟 পান্তা-ইলিশ: ঐতিহ্য না আধুনিকতা?
- ঐতিহ্যগত বর্ষবরণে পান্তা-ইলিশের কোনও উল্লেখ ছিল না। গ্রামীণ বাংলায় বর্ষবরণ মানেই ছিল নতুন বছরের শুরুতে ঘরবাড়ি পরিস্কার, হালখাতা, মিষ্টিমুখ ইত্যাদি।
- পান্তা-ইলিশ জনপ্রিয়তা পায় মূলত নব্বইয়ের দশকে, বিশেষ করে ঢাকার রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আশপাশে।
- এটি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে গৃহীত হলেও, এটি এক ধরনের ব্যক্তিগত বা সামাজিক পছন্দ মাত্র।
🛑 কিছু বিতর্ক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি:
- এই সময় ইলিশ ধরা “জাটকা নিধন” হিসেবে বিবেচিত হয়, যা আইনত নিষিদ্ধ।
- অনেকেই বলেন, পান্তা-ইলিশ এক ধরনের আনুষ্ঠানিক লোক দেখানো সংস্কৃতি, যা প্রকৃত বর্ষবরণ চেতনাকে আড়াল করে।
✅ তাহলে বর্ষবরণে কী করা উচিত?
- উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করা
- বাঙালিয়ানার পোশাক পরা (পাঞ্জাবি, শাড়ি ইত্যাদি)
- গান, নৃত্য, কবিতা, মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ
- এবং চাইলে, হালকা ঘরোয়া খাবার বা পান্তা-ইলিশও!
🕌 ধর্মীয় বিধান বনাম সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ
মুমিন মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, কোরবানি একটি ধর্মীয় ফরজ ইবাদত। ঈদুল আজহার কোরবানিতে গরু বা ছাগল জবাই দেওয়া মুসলমানদের জন্য শরিয়ত অনুযায়ী বাধ্যতামূলক, যদি তারা সামর্থ্যবান হন। এটি একটি নির্ধারিত বিধান, যার মূল উদ্দেশ্য আত্মত্যাগ, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং সাম্যবোধ জাগ্রত করা।
অন্যদিকে, পহেলা বৈশাখে ইলিশ মাছ খাওয়া বা পান্তা-ইলিশ আয়োজন— এটি কোনো ধর্মীয় বা ফরজ কাজ নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক রীতি, তাও আবার আধুনিক কালের সৃষ্টি। এটি বাঙালি সমাজে জনপ্রিয় হয়েছে মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে, এবং এটি একেবারেই ঐচ্ছিক— কেউ চাইলে পালন করতে পারেন, না করলেও কোনো অসংগতির বিষয় নেই।
✅ সারাংশ:
👉 পান্তা-ইলিশ খাওয়া একেবারেই বাধ্যতামূলক নয়।
👉 এটি একটি ব্যক্তিগত বা সামাজিক অভ্যাস।
👉 বর্ষবরণ উদযাপন হৃদয়ের বিষয়— খাওয়ার মাধ্যমে নয়, চেতনার মাধ্যমে।
👉কোরবানি: ধর্মীয় ফরজ ইবাদত (সম্ভব হলে পালন আবশ্যক)
👉পান্তা-ইলিশ: সাংস্কৃতিক আয়োজন (ইচ্ছাধীন ও ঐচ্ছিক)
তুমি কি এবছর পান্তা-ইলিশ খাচ্ছো, নাকি ভিন্ন কিছু ভাবছো বর্ষবরণে? 😊
উপসংহার
পান্তা-ইলিশ এখন পহেলা বৈশাখের অনুষঙ্গে পরিণত হলেও, এর শুরুটা ছিল একেবারে সদ্য আধুনিক যুগে। এটি বাঙালির সংস্কৃতির একটি চলমান অধ্যায়, যার উৎপত্তি ও বিকাশের পেছনে রয়েছে ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যিকতা। তবে বর্ষবরণের আসল আবেদন যেন থেকে যায়— আনন্দ, ঐক্য এবং বাঙালিয়ানার গৌরব উদযাপনেই।
