ডারউইনের ভুল তত্ত্ব বনাম আদম হাওয়ার ধপাস তত্ত্ব

ডারউইনের ভুল তত্ত্ব

আজ বেশ কয়েকদিন ধরে ফেসবুকে কিছু পোস্ট দেখালাম । বিবর্তন তত্ত্ব যে ভুল সেটা প্রমাণ করার জন্য মুমিনরা উঠে পড়ে লেগেছে। তবে দুঃখের বিষয় এখন পর্যন্ত মুমিনদের মধ্যে বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে পরিষ্কার কোন ধারণা নেই। তারা বিবর্তন তত্ত্ব ভুল প্রমাণ করতে গিয়ে ডারউইন যে ভুল ছিল সেটা প্রমাণ করতে চান। কিন্তু মুমিনরা যেটা বুঝেন না সেটা হল ডারউইন আজ থেকে ১৬০ বছর আগে কি বলেছে সেটা এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়।

বানর থেকে মানুষ সৃষ্টি এটা ডারুইনের বিবর্তন তত্ত্ব নয়, এটা হলো মুল্লার বিবর্তন তত্ত্ব । ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে কিছুটা ধারণা নেওয়ার জন্য নিচের ভিডিওটি দেখুন।

ডারউইনের তত্ত্ব নিয়ে অনেক মুমিনের মধ্যে ভুল ধারণা আছে। তাই তারা নানা রকম প্রশ্ন করে যেমন

১. বানর থেকে মানুষ আসলে এখনো বানর কেন আছে?

২. বিবর্তন কি মানুষ পর্যন্ত শেষ?

৩. মাঝের গুলো কোথায়? বা মিসিং লিঙ্ক কোথায়? মানুষের থেকে উন্নত কিছু হয় নি কেন?

৪. বিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া। তাহলে বিবর্তন থেমে গেছে কেন?

৫. বিবর্তন কি জীবনের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে পারে?

এই প্রশ্ন গুলো থেকে বোঝা যায় যে মুমিনদের বিবর্তন তত্ত্ব সম্পর্কে ন্যুনতম জ্ঞান নাই। নিচের কিছু লাইভ ভিডিও দিয়ে দিচ্ছি যা থেকে আপনারা বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন আশা করি।

কোন বিজ্ঞানী নবীর মতো নয় যে তার কাছে অহি নাজিল হয়েছিল এবং তাকে ভুল প্রমাণ করতে পারলেই তার সমস্ত কথা ভুল হয়ে যাবে। বিজ্ঞান এভাবে কাজ করে না। আসলে মুমিনদের বিজ্ঞান সম্পর্কে ন্যুনতম জ্ঞান না থাকায় এ সমস্যা হয়। বিবর্তনতত্ত্ব বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা মেনে নিয়েছে এবং বর্তমানে ৯৭% বিজ্ঞানী বিবর্তন কে সত্য এবং ফ্যাক্ট হিসাবে মানে। দু একজন বিজ্ঞানী যদি এমন বলে যে বিবর্তনের অমুক যায়গায় সমস্যা আছে অথবা অমুক জিনিষটার ব্যাখ্যা নেই – এ থেকে কিন্তু বিবর্তন তত্ত্ব ভুল প্রমানিত হয় না। আবার কেউ যদি দাবী করে যে বিবর্তন হয়ে মানুষ হওয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই, তাহলে বলবো বিবর্তনের মতো এত এত প্রমাণ আর অন্য কোন তত্ত্বের নেই।

মানুষ ও বানরের মিসিং লিংক কোথায়?

অনেকেই এই আর্গুমেন্ট নিয়ে আসেন যে মানুষ এবং মানুষের কাছা কাছি প্রাণীর মধ্যে প্রচুর পার্থক্য করেছে। এখানে একটা মিসিং লিঙ্ক থাকার কথা। কিন্তু আসলে এই মিসিং লিঙ্ক কন্সেপ্ট টাই ভুল। আপনি যদি চিন্তা করেন যে মানুষ এক সরল রেখায় বিবর্তন ঘটেছে তাহলে মিসিং লিঙ্ক কনসেপ্ট আসে, কিন্তু যদি আপনি আধুনিক যে কনসেপ্ট আছে, যেটাকে আমরা বলি বায়লজিকাল ফাইলজিনি, সেখানে কোন মিসিং লিঙ্ক থাকা সম্ভব নয় বা ।

ফাইলজিনি মডেল A Simplified Human Family Tree/Phylogenetic Model

ফাইলজিনি বা ফাইলোজেনেটিক ট্রি একটি মডেল যা আমাদের পূর্ব পুরুষদেরদের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে যে সম্পর্ক রয়েছে সেটা দেখায় এবং কিভাবে এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতিতে পরিবর্তন হয়েছে সেটা দেখায়। এই ফাইলোজেনেটিক মডেল তৈরি করা হয় জেনেটিক এবং শারিরিক বৈশিষ্ট গুলো বিবেচনা করে। পৃথিবীর সমস্ত পশু পাখীই একটি ফাইলো জেনেটিক মডেলের অন্তর্ভুক্ত, যা দিয়ে আমরা এই নিদর্শন পাই যে তারা একটি সাধারণ বংশের অন্তর্ভুক্ত । নিচে মানুষের ফাইলোজেনেটিক মডেল দেওয়া হল।

মাইক্রো/ম্যাক্রো ইভলুশন

আসলে বিবর্তন কে মাইক্রো এবং ম্যাক্রো ইভোলিউশন – এই দুই ভাগে ভাগ করা কতো খানি যুক্তি সংগত সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আসলে সমস্ত প্রানির কিছু না কিছু বিবর্তন ঘটে মাইক্রোস্কপিক লেভেলে, এবং ন্যাচারাল সিলেকশন এবং মিউটেশনের মধ্য দিয়ে মাইক্রোইভলুশন হয়। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তন গুলোই যখন অনেক সময় এবং অনেক গুলো জেনারেশন পার করে, তখন সেটা এক সময় বিশাল পরিবর্তনে রুপ নেয় ।

এক প্রজাতি থেকে কি ভিন্ন প্রজাতিতে বিবর্তন হওয়া সম্ভব?

এক প্রজাতি থেকে আরেকটি প্রজাতি হচ্ছে সেটা আমরা প্রমাণ পাই, যেমন কুকুর এসেছে নেকড়ে থেকে। এবং দুইটা ভিন্ন প্রজাতি। ছোট ছোট পরিবর্তন যখন অনেক দিন সময় নিয়ে ঘটে তখন বিশাল বিশাল পরিবর্তন হয় এবং ভিন্ন প্রজাতি হয়।

নেকড়ের একটি দল যখন মানুষের সাথে বসবাস শুরু করে তারা পরিবর্তিত হয়ে কুকুর হয়ে গেছে। এটা বহু দিনের বিবর্তনের ফল এবং এই পরিবর্তন গুলো বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছে। এক দল নেকড়ে, যারা জঙ্গলে থাকে তারা পরিবর্তন হয় নি এবং কুকুরের সাথে তারা মিলনের মাধ্যমে বাচ্চা তৈরি করতে সক্ষম নয়। যখন এক প্রজাতি অপর প্রজাতির সাথে বাচ্চা তৈরি করতে পারেনা তখন আমরা তাকে স্পিসিএশন বলি বিজ্ঞানের ভাষায়।

জীবনের প্রথম শুরু

অনেক মুমিনরাই জীবনের শুরু এবং ইভল্যুশনকে এক করে ফেলেন। জীবনের শুরু বিবর্তন তত্ত্ব থেকে ভিন্ন। বিবর্তন তত্ত্ব জীবনের শুরু ব্যাখ্যা করে না। জীবনের শুরু নিয়ে আমাদের কাছে সলিড কোন থিওরি নেই। আমরা বিভিন্ন হাইপথিসিস পাই, যেমন ঃ –

এবায়োজেনেসিস, যেখানে বলা হয় জীবনের শুরু হেয়েছে পৃথিবীর আদি অবস্থান থেকে, জড় বস্তু থেকে জীবন এসেছে।

এবং প্যান্সপারমিয়া, যেখানে বলা হচ্ছে জীবনের উদ্ভব মহা-শুন্যের অন্য কোন গ্রহে বা অন্য কোথাও হয়েছে।

বিবর্তন তত্ত্বের প্রমাণ কি?

আমাদের আগের বেশ কিছু লেখায় আমরা বিবর্তন তত্ত্বের প্রমাণ নিয়ে লিখেছি। যেখানে শুধু ফসিল রেকর্ড নয়, বিবর্তনের বিভিন্ন লাইন অব এভিডেন্স থেকে আমরা প্রমাণ দিয়েছি । যেমন আরকিওলজি, পেলিটিওলজি, জেনেটিক্স, মাইক্রো বায়লজি, ফারমাসি, ইত্যাদি ইত্যাদি বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু ধরে নিলাম বিবর্তন ভুল, তাহলে কি হচ্ছে? তাহলে আমাদের উত্তর হবে মানুষ কিভাবে পৃথিবীতে এসেছে সেটা আমরা জানিনা। এবং আমরা অন্য একটি থিওরি খুঁজবো ।

কিন্তু বিবর্তন যতই অসম্ভব মনে হোক না কেন, আকাশ থেকে ধপাস ধপাস করে আদম হাওয়া পড়ার সম্ভাবনা কতটুকু? আপনাদের কি এটার সপক্ষে কোন প্রমাণ আছে? আপনারা বিবর্তন নিয়ে যেভাবে চুল চেরা বিশ্লেষণ করেন, সেভাবে তো আদম হাওয়ার ধপাস তত্ত্ব নিয়ে বিশ্লেষণ করতে দেখিনা? নাকি এটা আপনার কুরানে আছে দেখে চোখ বুজে মেনে নেওয়া যায়? কোন বিজ্ঞানী কি আজ পর্যন্ত এটা বলেছে যে “বিবর্তন তত্ত্ব মিথ্যা কিন্তু আকাশ থেকে আদম হাওয়া ধপাস ধপাস করে পড়েছে এটাই সত্য?

মানুষের বিবর্তন পর্ব – ১ । Human Evolution 1

তথ্য সুত্রঃ

Level of support for evolution

বিবর্তন তত্ত্বের প্রমাণ কি? Evidence for Evolution

লাইন অব এভিডেন্স (Evidence for evolution – খান একাডেমি)

One thought on “ডারউইনের ভুল তত্ত্ব বনাম আদম হাওয়ার ধপাস তত্ত্ব

  1. Pingback: মূর্খ ডঃ জাকির নাইক | সত্যের সন্ধানী

Leave a comment