এটা কি এবং কে আবিষ্কার করেন?
এবার আসুন আমরা দেখি কোরানের সংখ্যাতত্ত্ব মোজেজা উনিশ (১৯) বা, Mathematical Miracle 19 আসলে কি? এবং এটা কে আবিষ্কার করেন।
“১৯৭৪ সালে রাশাদ খালিফা নামক একজন মিশরীয়-মার্কিন জৈব-রসায়নবিদ ও ধর্মতাত্ত্বিক দাবী করেন যে, কোরআনে ১৯ সংখ্যাকে কেন্দ্র করে একটি জটিল গাণিতিক অলৌকিক মোজেজা বা মিরাকল রয়েছে। ১৯ সংখ্যাটির ১ এবং ৯ এর যোগফল হচ্ছে ১০, এবং ১ এবং ০ এর যোগফল হচ্ছে ১। অর্থাৎ এখানে আসলে এক আল্লাহকেই বোঝানো হচ্ছে।” – কোরআনের ১৯ মোজেজা প্রসঙ্গে
এই ১৯ এর দাবী কেন?
রাশাদ খালিফা এই দাবি করেন যে এই ১৯ সংখ্যা দ্বারা কোরানকে সুরক্ষিত করা হয়েছে। তার দাবি গুলো হলঃ
১. কোরানের আয়াত সংখ্যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য।
২. কোরানের সুরার সংখ্যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য।
৩. কোরানের মোট অক্ষর সংখ্যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য।
প্রথমে আমরা দেখি রাশাদ খলিফা ১৯ সংখ্যা টি কোথায় পেলেন এবং এই দাবি গুলোর মধ্যে যে মিথ্যাচার গুলো রয়েছে সেটা দেখি।
রাশাদ খালিফা ১৯ কোথায় পেলেন? সূরা মুদাচ্ছিরের ৩০ নম্বর আয়াত
তিনি এটা সূরা মুদাচ্ছিরের ৩০ নম্বর আয়াত থেকে পেয়েছেন। কোরআনে ১৯ সংখ্যার মিরাকল বা অলৌকিকত্ব প্রমাণের জন্য শুরুতেই রাশাদ খলিফা যেই কাজটি করেছেন, তা হচ্ছে, উনি দাবী করেছেন, সূরা মুদাচ্ছিরের ৩০ নম্বর আয়াতে পরিষ্কারভাবেই ১৯ সংখ্যার গোপন রহস্যের কথা বলা হয়েছে। আয়াতটি আসুন আমরা পড়ে নিইঃ
“ইহার উপর নিয়োজিত আছে উনিশ (ফেরেশতা)।” [৭৮ঃ৩০]
এর ব্যাখ্যা উনি এভাবে দিয়েছেন যে ইহার উপরে আছে উনিশ । তার মানে হচ্ছে এই কোরান কে ১৯ দিয়ে সুরক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা তফসিরে কি পাই সেটা দেখি।
তাফসীর কী বলে?
রাশাদ খলিফা সহ আরো অনেকেই এইরকম দাবী করেছেন যে, ঐ ১৯ জন ফেরেশতার জায়গাতে আসলে ফেরেশতা বোঝানো হয় নি, ইঙ্গিতে অন্য কিছু বোঝানো হয়েছে। তাহলে আমাদের দেখা দরকার, প্রখ্যাত ক্লাসিক্যাল তাফসীর লেখকগণ এই আয়াতটির কী ব্যাখ্যা করেছেন। তাহলে পড়ি তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে, যা সারা পৃথিবীতে সবচাইতে বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত।


প্রখ্যাত এবং সেই ক্ল্যাসিকাল যুগের সকল ইসলামি চিন্তাবিদ ও তাফসীরকারকই এই সূরার ‘উনিশ’ বলতে জাহান্নামের সাকার নামক দোজখে নিয়োজিত উনিশ জন ফেরেশতার কথাই বলেছেন। নবী নিজেই সেরকমই বলেছেন, যা তাফসীরেই পাওয়া যায়। এই সূরার এই আয়াতের এই সংখ্যাটিকে উনি কেন বেছে নিলেন নিজের দাবীকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, তা সহজেই বোঝা যায়। কারণ হচ্ছে, মূর্খ এবং অন্ধবিশ্বাসী মানুষদের বোকা বানানো।
মজার বিষয় হচ্ছে, এই আয়াতের পরের আয়াতেই কিন্তু এই উনিশ দ্বারা কী বোঝানো হচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করা আছে। এমনকি, অধিকাংশ প্রখ্যাত অনুবাদকও ব্রাকেটের ভেতরে লিখে দেন, এই ১৯ দ্বারা আসলে জাহান্নামের প্রহরী ১৯ জন ফেরেশতার কথা বলেছেন।
আসুন এবারে এই সূরাটির ২৬ নম্বর আয়াত থেকে পড়ি, MUHIUDDIN KHAN এর অনুবাদ থেকে
আমি তাকে দাখিল করব অগ্নিতে।আপনি কি বুঝলেন অগ্নি কি? এটা অক্ষত রাখবে না এবং ছাড়বেও না। মানুষকে দগ্ধ করবে। এর উপর নিয়োজিত আছে উনিশ (ফেরেশতা)। আমি জাহান্নামের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতাই রেখেছি। আমি কাফেরদেরকে পরীক্ষা করার জন্যেই তার এই সংখ্যা করেছি-যাতে কিতাবীরা দৃঢ়বিশ্বাসী হয়, মুমিনদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং কিতাবীরা ও মুমিনগণ সন্দেহ পোষণ না করে এবং যাতে যাদের অন্তরে রোগ আছে, তারা এবং কাফেররা বলে যে, আল্লাহ এর দ্বারা কি বোঝাতে চেয়েছেন। এমনিভাবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে চালান। আপনার পালনকর্তার বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন এটা তো মানুষের জন্যে উপদেশ বৈ নয়।
লক্ষ্য করে দেখুন, এখানে পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে, ১৯ দ্বারা আসলে জাহান্নামের প্রহরী হিসেবে নিয়োজিত ফেরেশতাদের কথাই বোঝানো হয়েছে।
কোরআনের আয়াত সংখ্যা কতো? এটা কি ১৯ দ্বারা বিভাজ্য?
কোরআনের আয়াতের সংখ্যা নিয়ে মুমিনরা রীতিমত জ্বালিয়াতি করে ১৯ এর মিরাকেল দাবী করেছেন । তাদের দাবি হল কোরআনের আয়াত সংখ্যা হচ্ছে ৬৩৪৬, যা ১৯ সংখ্যা দ্বারা বিভাজ্য (১৯×৩৩৪=৬৩৪৬)। একইসাথে, ৬৩৪৬ সংখ্যাটিতে থাকা অঙ্কগুলোর যোগফলও ১৯ (৬+৩+৪+৬=১৯)।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কোরআনের আয়াতের সংখ্যা আসলে কত, তা নিয়ে ইসলামের অনুসারীদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। বিভিন্ন জনের মতামত অনুযায়ী এই সংখ্যাটি ৬০০০/ ৬২০৪/ ৬২১৪/ ৬২১৯/ ৬২২৫/ ৬২২৬/ ৬২৩৬/ ৬২১৬/ ৬২৫০/ ৬২১২/ ৬২১৮/ ৬৬৬৬/ ৬২২১/ ৬৩৪৮, অর্থাৎ আয়াত ঠিক কয়টি, তা সেই সম্পর্কে সঠিকভাবে কিছু বলা যায় না। আয়াতের পাশাপাশি অক্ষর ও শব্দের সংখ্যা নিয়েও প্রচুর মতানৈক্য রয়েছে। শুধু তাই নয়, এই নিয়ে ঘটে গেছে বহু রক্তারক্তি কাণ্ড। – কোরআন সংকলন এবং পরিমার্জনের ইতিহাস

কোরআনের সর্বমোট সূরার সংখ্যা কত?
রাশাদ খলিফা দাবী করেছেন, কোরআনের সর্বমোট সূরার সংখ্যা ১১৪ টি, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য। অথচ, তাফসীরে ইবনে কাসীর [ তথ্যসূত্রঃ তাফসীরে ইবনে কাসীর। ইসলামিক ফাউন্ডেশন। চতুর্থ খণ্ড। পৃষ্ঠা ৫১২, ৫১৩] থেকে জানা যায়, সূরা তওবা যে স্বতন্ত্র সূরা, এটি ছিল উসমানের ধারণা। মুহাম্মদ এই বিষয়ে কিছু বলে যান নি। সূরা তওবার শুরুতে তাই বিসমিল্লাহও পড়া হয় না। এখন লাওহে মাহফুজের কোরআনে সূরা তওবা আলাদা সূরা নাকি তা সূরা আনফালের অংশ, তা কারো পক্ষেই জানা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, উসমানের ধারণার ওপর যা প্রতিষ্ঠিত, তা কি আমরা শতভাগ শুদ্ধ হিসেবে গণ্য করতে পারি? তাহলে সূরা তওবা যদি স্বতন্ত্র সূরা না হয়েই থাকে, তাহলে কোরআনে সূরার সংখ্যা হয় ১১৩ টি। যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।
কোরআনে বর্ণের সংখ্যা কত?
রাশাদ খলিফা দাবী করেছেন, কোরআনের মোট বর্ণ সংখ্যা ৩,২৯,১৫৬, যা ১৯ দিয়ে বিভাজ্য (১৯×১৭৩২৪=৩২৯১৫৬)।
কোরআনের মোট বর্ণ সংখ্যা কত, তা নিয়েও রয়েছে বিভিন্ন ইসলামিক স্কলারের বিভিন্ন রকম মতামত বা ধারণা।
-
হযরত মুহাম্মদের প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এর মতে কোরআনের বর্ণের সংখ্যা ৩,২২,৬৭১ টি ( ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয় )
-
মোজাহেদ এর মতে, ৩,২১,১২১ টি ( ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয় )
এরকম আরো অনেকগুলো মত রয়েছে।
রাশাদ খলিফার আরো কিছু মিথ্যাচার ও গোঁজামিল
এরকম ধরে ধরে রাশাদ খলিফার প্রায় প্রতিটি দাবীকেই মিথ্যা প্রমাণ করা যায়। সবচাইতে মজার বিষয় হচ্ছে, রাশাদ খলিফার কোরআনের সাথে ১৯ এর মিল করতে গিয়ে সূরা তওবার ১২৮ এবং ১২৯ নম্বর আয়াত দুটি বেমালুম উধাও করে দিয়েছেন। কারণ এই আয়াত দুইটি থাকলে তার ১৯ তত্ত্ব কিছুতেই মেলে না।
আরো মজার বিষয় হচ্ছে, রাশাদ খলিফা তার নিজের ইংরেজি অনুবাদকৃত কোরআনের ‘সুরা ফুরকান’, ‘সুরা ইয়াসিন’, ‘সুরা শুরা’ এবং ‘সুরা তাক্ভির’-এর আয়াতে নিজের নাম পর্যন্ত ঢুকিয়ে দিয়েছেন, এবং দাবী করেছেন, তার সম্পর্কে কোরআনে ভবিষ্যত বাণী করা হয়েছে। উনার অনুবাদ হচ্ছে, [ Sura – 25 The Statute Book (Al-Furqan)]
We have sent you (Rashad) as a deliverer of good news, as well as a warner. [Quran 25:56]
