বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মিথ্যাচার – কিন্তু কেন?

_102201283_34962816_1641443722648399_1857187091931201536_n.jpg

মুসলমানদের মধ্যে গুজব খুব সহজেই ছড়িয়ে যায়। এর কারণ হচ্ছে তারা যদি এমন কিছু শুনতে পায় বা জানতে পারে যেটা তাদের “পূর্ব বিদ্যমান ” বিশ্বাসের সাথে মিলে যায়, তবে তারা সেটা বিনা বাক্য ব্যয়ে এবং কোন প্রকার প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বাস করে। এর একটা উদাহরণ হল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ছড়ানো কিছু মিথ্যাচার, যেটা বর্তমানে মুসলমানেরা, এমন কি অনেক শিক্ষিত কিছু মহল ও বিনা বাক্য ব্যায়ে এবং বিনা বিচারে, কোন প্রকার যাচাই না করেই, বিশ্বাস করে নিচ্ছে। 

গুজবের কাহিনী বাংলাদেশে নতুন নয়। ছেলে ধরা গুজবে প্রাণ হারাতে হয়েছিল তসলিমা বেগমকে, নবীকে নিয়ে কটূক্তি করার গুজব কে কেন্দ্র করে ভোলায় রীতিমতো পুলিশের সাথে যুদ্ধ হয়ে গেছে এক শ্রেণীর মুসলিম জন গোষ্ঠীর। এখন তার সাথে যুক্ত হয়েছে করোনা ভাইরাস। এ বিষয়ে প্রথম থেকেই হুজুর রা নানা রকম জল্পনা কল্পনা করে যাচ্ছে। প্রথমে বলা হচ্ছিল এটা আল্লাহ্‌র গজব। এর পর এই গুজব যখন কমে আসলো, তখন এক শ্রেণীর শিক্ষিত মহল গুজব ছড়াতে শুরু করলো যে এটা চায়নার সৃষ্টি। এবং উদ্দেশ্য একটাই, মুসলিম নিধন।

তো যে কোন ঘটনার পিছনেই মুসলিমরা ষড়যন্ত্র খুঁজে পায়। এর প্রধান কারণ হল মুসলিম সম্প্রদায়ের অল্প শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, এবং তাদের মৌলিক বিশ্বাস, যেটার মুলে রয়েছে কোরান ও হাদিস।

কোরান হাদিসে অনেক বার বলা হয়েছে মুসলিমরা যেন ইহুদি নাসারা, কাফেরদের বিশ্বাস না করে । তারা সব সময়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাজ করে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো জেনে, এবং বিশ্বাস করে যে মুসলিম সমাজ বড় হয়, তাদের কোন প্রকার গুজব বিশ্বাস করা সহজ।

এবার আসি রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে নিয়ে অনেক অনেক গুজব চালু আছে, যার মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ নজরুলের লেখা চুরি করে নোবেল পেয়েছিলেন। আর এখন এই যুগে নতুন করে আরেক গুজব চালু হচ্ছে মুসলিমদের মাঝে, সেটা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন।

এর মুলেও রয়েছে ধর্ম। কারণ রবীন্দ্রনাথ “একজন হিন্দু” বলে তারা মনে করেন। এখন হিন্দুদের নিয়ে মুসলিমদের চুলকানি তো অনেক দিনের। তারা জন্মগত ভাবেই ভারত বিদ্বেষী। এবং তার উপর তারা জাতীয়তাবাদের এবং গণতন্ত্রের ও বিপক্ষে। এখন যদি কোন সরকার না থাকতো তাহলে তারা শারিয়া আইন চালু করে দিত এবং দেশে খিলাফত কায়েম করে দিত।

বাংলাদেশের একটা বিরাট অংশের মানুষের মুখ্য আলোচ্য বিষয় হচ্ছে- রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে যোগ্য কিনা। এবং এর পক্ষে তারা যে যুক্তি গুলো দেয় তা হল ঃ

এ পর্যন্ত জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের তিন দফা চেষ্টা করা হয়েছে

  • একজন হিন্দুর লেখা সংগীত আমাদের দেশের জাতীয় সংগীত হবে কেন?

  • রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় না হওয়ার পক্ষে ছিলেন তিনি বলেছিলেন মুসলিম রা মূর্খ, তাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় করে লাভ কি?

  • অন্য দেশের রচয়িতার সংগীত আমাদের দেশের জাতীয় সংগীত করা হবে কেন?

মডারেট মুসলিমদের মধ্যে এবং শিক্ষিত শ্রেণীর মুসলিমদের মধ্যেও একদল আছেন যারা এটা সমর্থন করে যাচ্ছেন যে রবীন্দ্রনাথের গান কে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা উচিৎ নয়।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা হয়েছিল ইতিহাস ঘাঁটলে তথ্য পাওয়া যায়।

যারা বিরোধিতা করেছিলে:

বিবিসি বাংলার আর্টিকেল  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছিলেন যারা  থেকে পাওয়া যায়

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বিরোধী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আর রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর নাম সৈয়দ আবুল মকসুদের ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা’ বইতে উঠে এসেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু লোকজনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন বলে উল্লেখ করা হয়।”

“সেই সময়কার সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা এবং রবীন্দ্রনাথের সেই সময় যাদের সাথে উঠা-বসা ছিল তাদের কয়েকজন ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে।” তাই অনেকেই সহজ সমীকরণ মিলিয়ে লিখেছেন তিনিও এর বিপক্ষেই ছিলেন। কিন্তু উনি যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে ছিলেন, এমন কোন প্রমাণ বা দলিল পাওয়া যায় না। বরং তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে কাজ করেছিলেন, এমন প্রমাণ ই পাওয়া যায়।

gurudev.png

আরও পড়ুনঃ  এ পর্যন্ত জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের তিন দফা চেষ্টা করা হয়েছে

তথ্য সুত্রঃ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছিলেন যারা

রবীন্দ্রনাথের আমরা, আমাদের রবীন্দ্রনাথ

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কিছু মিথ্যাচার ও তার জবাব–বাকি বিল্লাহ

রবীন্দ্রনাথের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধিতা প্রসঙ্গ || সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস Vs সৌমিত্র শেখর || বিতর্ক 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস

Leave a comment