
২০০৫ সালে বিবিসি’র খবরে দুনিয়া শিউরে উঠেছিল যখন ইরাণের কোর্টে স্ত্রী আবেদন করেছিল তার স্বামীকে আদেশ দিতে যাতে সে তাকে প্রতিদিন না মেরে সপ্তাহে একদিন মারে, স্বামী দাবি করেছিল এ তার ইসলামি অধিকার।
ইসলাম স্ত্রী প্রহারের অনুমতি দেয়। কিন্তু অনেকেই স্ত্রী প্রহারের সহিহ তারিকা জানেন না। কি কি কারণে এবং কি কি ভাবে কোথায়, স্ত্রীদের প্রহার করা যাবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা কোরান ও হাদিসে আছে।
ইসলামিক সারিয়া অনুযায়ী স্ত্রীকে পিটানোর কিছু নির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। সহিহ ইসলামিক তারিকায় বউ পিটালে বউয়ের গায়ে কোন দাগ ফেলা যাবেনা, এবং বউয়ের মুখে মারা যাবেনা। [ সূত্রঃ মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) – হাদিস নম্বরঃ ৪০৭৭]
কিভাবে মারলে স্ত্রীর গায়ে দাগ পড়বে না সেই “বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির” ওপর নামকরা মওলানার লেখা কেতাবও আছে।
স্ত্রী-প্রহারের সুস্পষ্ট আয়াত আছে সুরা ছোয়াদ এর ৪৪ নং আয়াতে এ।
“(আমি তাকে বললাম) কিছু ঘাস লও আর তা দিয়ে আঘাত কর, (আর তোমার স্ত্রীকে একশত বেত্রাঘাত করার শপথ) ভঙ্গ করো না।” [৩৮:৪৪]
এতে হজরত আয়ুবকে (আঃ) বলা হয়েছে গাছের কাঁচা ডাল দিয়ে স্ত্রীকে প্রহার করতে (কেউ কেউ অনুবাদ করেছেন ‘তৃণ-শলাকা’ − এটা ঠিক নয়)
আল্লাহ কোরানে পরিষ্কার ভাবে বলেছেন যে পুরুষরা নারীর উপর কর্তৃত্ব শীল তাই নারীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পুরুষরা নারীদের প্রহার করতে পারে।
সুরা নিসা, আয়াত ৩৪ (৪:৩৪):
“পুরুষরা নারীর উপর কর্তৃত্ব শীল। এ জন্য যে আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সেমতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগত এবং আল্লাহ যা হেফাজত যোগ্য করে দিয়েছেন লোকচক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাজত করে। আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশংকা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করোনা।”
তার মানে স্ত্রীরা যদি স্বামীর বাধ্য না হয় তাহলে তাদের প্রহার করা যাবে। কিন্তু এই আয়াতে প্রহার বলতে কি বুঝানো হয়েছে তা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক আছে। তবে স্ত্রী অবাধ্য কি না তা ওই স্বামীই ঠিক করবে। এবং সে কখন কি-কারণে কিভাবে কতটা মারপিট করছে তা দেখার কেউ নেই।
পুরুষের কর্তৃত্বশীলতা বলেই দেয়া হল এখানে। কারণ তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। যে কর্তৃত্ব করে, আর যার ওপরে কর্তৃত্ব করা হয়, এ দু’জন কখনো সমান হয় না, হতে পারে না।
যদি আপনি জিজ্ঞাসা করেন যে আল্লাহ্ পুরুষদের অনুমতি দেয় তাদের স্ত্রীদের পিটানোর কিন্তু স্ত্রীদের কেন তাদের স্বামীদের পিটানোর অনুমতি দেয় না? এতে উত্তর পাবেন যে কারণ স্বামীদের শারীরিক শক্তি বেশি। অথবা স্বামীরা ইনকাম করে তাই।
কিন্তু তাহলে কি আল্লাহ্ শবলের পক্ষে আর দুর্বলের বিপক্ষে কথা বলেন? আর শারীরিক শক্তি দিয়ে যদি শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করা হত তাহলে আফ্রিকার গরিলারাই সর্বশ্রেষ্ঠ হত। আর যেসব নারীরা ইনকার করে তারা কি পুরুষদের পিটাতে পারবে?
বর্তমান বিশ্বে শারীরিক শক্তি দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করা একেবারেই হাস্য কর। আর টাকা দিয়েও কাউকে মহৎ ভাবা যায় না। যদি তাই হত তাহলে মানুষ টাকা কে সম্মান করতো, মানবতা কে নয়।
আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষ তাদের বউ পেটায় না সত্যি, কিন্তু কথাটা আসলে নীতির, নারী-অধিকারের ও সম্মানের। একজন মানুষ যদি আরেকজন মানুষের গায়ে হাত তোলার অধিকার পায়, তাহলে সমাজ ও সভ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
বাচ্চাদের সামনে বাবা তাদের মা’কে ধরে পেটানোর দৃশ্য অত্যন্ত কুৎসিত এবং বাচ্চাদের মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর। এ হিংস্রতা ও নোংরামিকে ইসলাম বৈধ করতে পারে না।
কিন্তু কোরান হাদিসে কোথাও স্ত্রীকে মারার ব্যাপারে নিষেধ নেই। বরং আয়শার একটি হাদিসে আছে যে মোহাম্মাদ নিজেই আয়শার বুকে ঘুষি মেরেছিলেন।
যারা বলেন রাসুল সা: এর স্ত্রীকে প্রহার করার কোন নজির নেই। তারা দেখুন হযরত আয়শা হতে বর্ণিত, “তিনি (মুহাম্মদ) আমাকে বুকের ওপর আঘাত করলেন যা আমাকে ব্যথা দিল।” [সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস -৩৯৬৩]
হাদিসে আছে নবীজী মেসওয়াক করার সময় লোকেরা তাঁকে বৌ-পেটানোর পদ্ধতি জিজ্ঞেস করলে তিনি নাকি মেসওয়াকটা ঠুস করে গায়ে লাগিয়ে বলেছিলেন − ‘এভাবে।’ এ-সব হাদিস নারীর মর্যাদার খেলাফ কারণ বিষয়টা কিভাবে মারছে বা কি দিয়ে মারছে সেটা নয়, বিষয়টা নীতির।
নবীজী নাকি বলেছেন, “যেমন ভাবে দাস- দাসীদের প্রহার কর তেমন ভাবে কখনো স্ত্রীদের মারবে না। তারপর রাতে তাদের সাথে শোবে” (সহি বুখারি হাফেজ আব্দুল জলিলের অনুবাদ হাদিস নং ২৪৬৮)।
“রোজ হাশরে কোন স্বামীকে জিজ্ঞেস করা হবে না কেন সে স্ত্রীকে মেরেছিল” (হাদিস নং ২১৪২ ইণ্টারনেটে সহি আবু দাউদ)
তবে স্বামী যতই অত্যাচারী হোক না কেন স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক প্রদানের অধিকার নেই। ইসলাম মতে শুধু মাত্র স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে। কিন্তু স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারেনা। স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে তালাক আদায় করে নিতে পারে।

