আমি যখন ছোট তখন খুব ধার্মিক ছিলাম। আমার কাছে বেশ কিছু ধর্মীয় বই পুস্তকও ছিল। তার মধ্যে কয়েকটি বইয়ের কথা মনে পড়ছে যেমন নিয়ামুল কোরান, বিশ্ব নবীর মেরাজ, এবং বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর জীবনী।
আমার দাদা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন এবং তার কাছে আরও মোটা মোটা ইসলামী বই দেখেছি। তখন আমার ধারনা ছিল না যে হাদিসের এত হাজার হাজার বই আছে। দাদা যখন আমাদের সাথে থাকতেন তখন ওনার কোরান তেলাওয়াতেই ভোরে ঘুম ভাঙত।
যাই হোক, আমার বাবা মোটেও ধার্মিক ছিলেন না। তিনি শুধু ইদের নামাজ ছাড়া কোন নামাজ পড়তে দেখি নি। আমাদের ও নামাজ রোজা করার জন্য কোন প্রকার প্রেশার ছিল না। তবে উনি একজন আধুনিক মানুষ ছিলেন। গান ভালোবাসতেন, প্রচুর বই পড়তেন, এবং অনেকবার বিদেশে গিয়েছেন, তাই মানসিকতাও সাধারণ বাঙালীদের চেয়ে উন্নত ছিল।
আমার বাবা গান ভালো বাসতেন তাই আমার বোন কে গান শিখানোর জন্য মনস্থির করেন। বাসায় হারমোনিয়াম, তবলা, চলে আসে। একজন নামকরা ওস্তাদ রাখা হয়। কিন্তু এতে আমার দাদা জান নারাজ ছিলেন। আমার আব্বা জানতেন আধুনিক সমাজে গান শেখা কোন খারাপ কিছু নয়, কিন্তু আমার দাদা যান হাদিস এবং কোরানের আলোকে ১০০% শিওর ছিলেন যে মেয়েকে গান শেখানো হারাম।
এটা তো সামান্য একটা ব্যাপার যেটা নিয়ে বাবা এবং দাদার মধ্যে মতের মিল ছিল না। কিন্তু ইসলামিক বই গুলিতে এমন ভয়ংকর এবং আজগুবি কিছু লেখা থাকতো যেটা আসলেই আমার শিশু মনে দাগ কেটেছিল।
আমি একবার বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর জীবনী বইটিতে ওনার অনেক কেরামতির কথা পড়েছিলাম। উনি নাকি মরা মানুষকে জিন্দা করেছিলেন ইত্যাদি। অনেকে যারা ধর্ম ভিরু, তাদের মধ্যে অনেক শিক্ষিত মানুষ ও এই সব বিশ্বাস করতো। কিন্তু আমার আব্বা বলেছিলেন এসব ভুয়া কথা লেখা আছে । কোন মানুষ ই কোন অলৌকিক কিছু করতে পারেনা, এমন কি নবীজি করেন নি।
আমি তখন নবীর চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করনের আর মেরাজের ব্যাপার টা জিজ্ঞেস করতে ভয় পেতাম। আব্বার সাথে ধর্ম নিয়ে তেমন কোন আলাপ হত না।
আমি একটা বই খুব মন দিয়ে পড়তাম সেটা হচ্ছে বিশ্ব নবীর মেরাজ । মেরাজে দোজখের বিভিন্ন বর্ণনা ছিল যা অনেক ভয়ংকর। আমি এই ভয়ংকর শাস্তি গুলোর কথা পড়ে এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করতাম।
যেমন নবীজি দেখতে পেলেন কিছু গরু দৌড়িয়ে এসে ছোট একটা গর্তে ঢুকার চেষ্টা করছে। নবীজি জিজ্ঞাসা করেন তারা এমন করছে কেন? উত্তর আসে এরা হল পৃথিবীতে যারা ছোট মুখে বড় কথা বলতো তাদের শাস্তি। বাহ বেশ মজার।
কিন্তু কিছু গা ঘিন ঘিন করা বর্ণনা ছিল । তার কিছু উদাহরণ দেই।
দোজখে পাঁচ ধরনের পানি পান করানো হবে এক. মায়ু হামীম (ফুটন্ত গরম পানি) দুই. মায়ু চাদিদ (ক্ষতস্থান থেকে নির্গত পুঁজ ও রক্ত) তিন. মায়ুল মুহল (তৈলাক্ত টগবগ করা পানি) চার. গাস্বাক্ব (কালো দুর্গন্ধময় পানি) পাঁচ. তিনাতুল খাবাল (জাহান্নামীদের ঘাম) আল্লাহ বলেন, “তাদেরকে পান করানো গলিত পুঁজ যা অতি কষ্টে (এক ঢোক করে ) গিলবে এবং এই (বিষাক্ত দুর্গন্ধ যুক্ত ) পানি গলাধঃকরণ করাও অসম্ভব হয়ে পড়বে, তাকে গ্রাস করবে মৃত্যু যন্ত্রণা, কিন্তু তার মৃত্যু হবে না আরো পশ্চাতে থাকবে কঠোর শাস্তি”
একটা শাস্তির কথা পড়ে বেশ হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম । নবীজি দেখতে পান একটা মেয়েকে উল্টা করে তার পায়ের সাথে চুল বাধা অবস্থায় আছে এবং তাকে বিদ্যুতের চাবুক দিয়ে পিটানো হচ্ছে। এই মেয়ের অপরাধ ছিল সে পৃথিবীতে ব্যভিচার করেছে।
আমি ব্যভিচার মানে কি তা জানতাম না, কিন্তু সেদিন আমার মনে একটা ভয়ংকর শাস্তির চিত্র ভেসে ওঠে যা আজও ভুলতে পারছি না।

