সত্য কখনও চাপা থাকে না

সক্রেটিসের মৃত্যুদন্ড নির্ধারিত হয়েছে আগেই। হেমলক বিষের পেয়ালা যখন সক্রেটিসের দিকে এগিয়ে দেওয়া হচ্ছিল তখন এক ভক্ত অনেক কান্না করছিল। সক্রেটিস তাঁকে বললেন;- “তুমি কাঁদছ কেন? আমি যদি প্রাণ বাঁচানোর জন্য সময়ের সাথে আপোষ করতাম তাহলেই বরং আমার মৃত্যু ঘটত। এখন আমার মরণ হচ্ছে না। তোমার তো আনন্দ করা উচিত।” আর একজন ছিলেম পাগলাটে জিয়োর্দানো ব্রুনো। ব্রুনো ছিলেন ছোটবেলা থেকেই অনাথ, জন্ম ১৫৪৮ খৃষ্টাব্দে ইতালীর নোলা শহরে। উরোপ তখন চলত চার্চের উপর ভিত্তি করে। সেসময় যেকোন বিজ্ঞানের যেকোন মতামত যা বাইবেলের বিপক্ষে যায় তা কেউ প্রকাশ করলেই ধর্মযাজকেরা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠতেন। নেমে আসত অমানুষিক নির্যাতন। যদিও তবু নতী স্বীকার না করে তাহলে মৃত্যুদন্ড। প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে তখন সবাই চার্চের কথামতো  বিশ্বাস করত;- “এই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে রয়েছে পৃথিবী এবং পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে গ্রহ, উপগ্রহ, কাশের নক্ষত্র সবকিছু।” — তখন ইতালিতে “দ্যা রেভোলিউশ্যানিবাস” নামে একটি বই বের করেন কোপার্নিকাস যেখানে তিনি লিখেছেন;- “সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্র এবং সূর্যকে কেন্দ্র করে সকল গ্রহ উপগ্রহ নিজের কক্ষপথে ঘুরছে। আমরাই শুধু বুঝি না।”

কোপার্নিকাস ছিলেন চার্চের পাদ্রী। তাই তিনি জানতেন যেহেতু তাঁর এই মতবাদ বাইবেলের বিপক্ষে তাই এটা প্রকাশ করলে বিপদ হতে পারে। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি একটু বুদ্ধির আশ্রয় নিলেন। উৎসর্গ করলেন পোপকে এবং উৎসর্গে লিখলেন;- “এই মতবাদ ভুল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এটা অনুমাননির্ভর।”  একদিন ব্রুনো চার্চের গ্রন্থাগারে বইটি পেয়ে যান। আগেই পোপ বইটাকে নিষিদ্ধ করে লে রেখেছিলেন এক কোণায়। বইটা পড়েই অস্থির হয়ে উঠেন ব্রুনো। এ যেন শুধুই তার জন্য লেখা। কোপার্নিকাস ভয়ে সত্য প্রকাশ করতে পারেন নি জোর গলায়। ব্রুনো সেটাই করতে লাগলেন। তিনি সবাইকে ডেকে বলতে লাগলেন;- ১) পৃথিবী নয় সূর্যই সবকিছুর কেন্দ্রস্থল। ২) সব গ্রহই নিজ অক্ষের চারদিকে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। সবাই ভড়কে যায় ব্রুনোর কথা শুনে। যেহেতু বাইবেলে লিখা আছে পৃথিবীই কেন্দ্র এবং পৃথিবী স্থির। ব্রুনোকে সাবধান করে দেয় সবাই। জীবনের ভয় দেখায়। কিন্তু ব্রুনো থেমে যাওয়ার পাত্র না। চার্চে সভা ডাকা হয়। ব্রুনোর কঠিনতম শাস্তির সিদ্ধান্ত হয়। উপায় না দেখে ব্রুনো ইতালি থেকে পালিয়ে ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে বেড়াতে লাগলেন। এতে করে লাভই হয় বেশি। আমরা বর্তমানে যে মতবাদ পড়ছি,”সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ঘুরছে” সেই মতবাদটি প্রচার হতে থাকল সারা ইউরোপে। একসময় ফাঁদ পেতে ব্রুনোকে ধরে ইতালিতে নিয়ে আসা হয়। শুরু হয় নির্মন নির্যাতন। ব্রুনো তবুও বলতে থাকেন সূর্যকে কেন্দ্র করেই পৃথিবী ঘুরছে।

একটি সীসার তৈরী ঘরে ব্রুনোকে রাখা হয়। ঘরটি শীতে হতো হিমালয় আর গরমে হতো উত্তপ্ত মরুভূমি। ব্রুনো তবুও পরাজয় স্বীকার করেন নি। ব্রুনো শয়তান, খৃষ্টান ধর্মের শত্রু এরকম ১০০টি অভিযোগ দাঁড় করানো হয় তাঁর বিরুদ্ধে। ১৬০০ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারীর কোন একদিনে ব্রুনোকে মহাআড়ম্বরে নিয়ে যাওয়া হয় বধ্যভূমিতে। হাত পা শেখল দিয়ে বাঁধা। জিভ শক্ত করে বাঁধা যেন শেষবারের মতো সত্যটি উচ্চারণ না করতে পারেন। মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো ব্রুনোকে দোষ স্বীকার করতে বলা হলো, বিনিময়ে মুক্তির প্রলোভন। ঘৃণাভরে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করলেন ব্রুনো।কটা দন্ডে বেঁধে পায়ে আগুন দেওয়া হলো ব্রুনোর। জনতা অবাক বিস্ময়ে দেখল ব্রুনোর সারা শরীরে আগুন জ্বলে উঠছে কিন্তু তিনি হাসছেন।

ব্রুনোর সমসাময়িকই ছিলেন গ্যালিলিও গ্যালিলি। পরবর্তীতে দূরবীন আবিষ্কার করে গ্যালিলিও ব্রুনোর মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করেন। গ্যালিলিওর উপরেও নেমে আসে নির্যাতন। বাইবেলের কথামতোই বলতে হবে পৃথিবী স্থির আর সূর্য এবং সকল গ্রহ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। গ্যালিলিও তখন চার্চের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়য়ে। শাস্তি পাঠ করা হলো;- “ধর্মবিরোধী মত, বাইবেল নিয়ে সংশয় এবং বিনা অনুমতিতে বই প্রকাশের অভিযোগে বাকি জীবন জেলে কাটাতে হবে এবং তিন বছর ধরে বাইবেলের সাতটি করে শ্লোক প্রতি সপ্তাহে উচ্চারণ করতে হবে।” রায় শুনে গ্যালিলিও বিড়বিড় করে বললেন,’ই প্যুর সি মিউওভে’। অর্থাৎ, তবুও পৃথিবী ঘুরবে। হ্যাঁ, গ্যালিলিও সেই উক্তি,’তবুও পৃথিবী ঘুরবে।’ ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হলো। গ্যালিলিওকে জেলে মারা হলো। সক্রেটিসকে হেমলক পান করিয়ে মারা হলো। কিন্তু সত্য থেমে থাকেনি। সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরেনি। পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘুরেছে এবং ঘুরবে। অবশেষে এই শতাব্দীতে এসে খ্রিস্টানরা মানুষ হয়েছে, তারা সত্যকে সত্য হিসেবে মেনে নিতে শিখেছে। তাইতো চার্চ গ্যালিলিও আর ব্রুনোর কাছে ক্ষমা চেয়েছে। কুপিয়ে মারবেন? লাভ কি? লেখালেখি থেমে থাকবে? কলমের জবাব কলমে দিতে হয়, চাপাতির আশ্রয় নেওয়া মানে স্বীকার করা যে সে যুক্তি প্রমানে হেরে গেছে তাই বাধ্য হয়ে প্রতিপক্ষকে সরাতে চাপাতির আশ্রয় নিয়েছে। চাপাতি দিয়ে মতাদর্শ দমন করা যায় না। তখন ধর্মোন্মাদেরা ছিল ইউরোপে আর এখন বাংলাদেশ এবং মধ্যযুগের আরবে। তবু সত্য বেরিয়ে আসবেই আসবে।
— তবুও পৃথিবী ঘুরবে।

..নিম্নে ছবিতে সক্রেটিস ও গ্যালিলিও,ব্রুনো। যাদের শারীরিক মৃত্যু হলেও আজীবন মৃত্যন্জয়ী।তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
Nasir Mohsin

36867552_2115756638711814_6956115366015664128_n.jpg

Leave a comment