অনেক দিন আগের কথা । লন্ডনের হিথরো এয়ারপোর্ট অপেক্ষা করছি ট্রান্সিট প্লেনের জন্য । যাবো বাল্টিমোর । যাওয়ার কথা ছিল ভার্জিনিয়ার ডালাস এয়ারপোর্টে, কিন্তু আবহাওয়া প্রতিকুল থাকার কারণে ফ্লাইট টি পরিবর্তন করে বাল্টিমোর করা হয়েছে দেখলাম । যাই হোক, বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে, তাই হিথরো এয়ারপোর্ট টি একটু ঘুরে দেখতে লাগলাম।
কিন্তু একটু দূরে যেটেই এক বাংলাদেশী পরিবারের সাথে দেখা হয়ে গেল । তিনি সপরিবারে, এয়ারপোর্টের মেঝেতে চাদর বিছিয়ে বসেছেন । এবং টিনের একটি টিফিন কেরিয়ারে কিছু খাবার নিয়ে তার চারপাশে বসে, সপরিবারে লাঞ্চ করতে ব্যস্ত । আমাকে দেখে বললেন, আপনি বাংলাদেশী? আমি বললাম হ্যাঁ । তিনি সাথে সাথে আমাকে লাঞ্চের দাওয়াত দিয়ে দিলেন । আমি বিনয়ের সাথে অফারটি প্রত্যাখান করে সামনে এগুলাম ।
বাঙ্গালী যেখানেই যায় বাঙ্গালীই থাকে । তা সে কমলাপুর রেল স্টেশন হোক অথবা যুক্তরাজ্যের সর্ববৃহৎ বিমানবন্দর লন্ডন হিথ্রো ই হোক । তবে বিদেশীরা আমাদের দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে । তারা কিছু মনে করে না । এমন কি তাকিয়েও দেখে না ।
তো সেদিন দুটো কারণে তার লাঞ্চ অফারটি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম । এক – আমি এমনিতেই কারো দেওয়া কিছু খাই না । আর এখন বাংলাদেশে অজ্ঞান পার্টির প্রকোপে আরো খাইনা । কেউ জম জমের পানি অথবা রোজার দিনে ইফতারি অফার করলেও এখন খাইনা । তার মানে এই নয় যে বাঙ্গালী ভালো মানুষ নেই । প্রচুর ভালো মানুষ আছে । কিন্তু এক বালতি দুধের মধ্যে এক ফোটা হাগু থাকলেই পুরো দুধ টা পানের অযোগ্য হয়ে যায় ।
আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, সেই লোকের সাথে লাঞ্চে বসলেই নানা রকম প্রশ্ন করবে । দেশ থেকে এলেন না যাচ্ছেন? দেশের কি অবস্থা? রাজনীতি বেকার সমস্যা, আরও না না রকম প্রশ্ন । আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে ইচ্ছা করে না । (ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে লাইনটা চুরি করলাম)
আজকেও আমার বেশ কিছু ব্যাপারে প্রশ্ন এসেছে । এখনকার হট টপিক হল প্রিয়া সাহার ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে নালিশ । আর এ থেকেই দেশে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে ।
মানুষে মানুষে এত বিভেদ কেন? কেন আমরা ধনি/গরিব, শিক্ষিত/অশিক্ষিত, আস্তিক/নাস্তিক, ধর্ম/বর্ণ , নারী/পুরুষ, হিন্দু /মুসলিম, সিয়া/সুন্নি ইত্যাদি ইত্যাদি বিভেদ সৃষ্টি করি? বয়স ও একটা ফ্যাক্টর। মানুষ একই বয়সী মানুষের সাথে এবং একই স্ট্যাটাসের মানুষদের সাথে বন্ধুত্ব করতে পছন্দ করে । তার বেশ কিছু যুক্তি সঙ্গত কারণ ও আছে । আমি এই বয়সে এসে বুঝি যে এগুলো কেন এবং কি অর্থ বহন করে ।
আজকে বেশ কিছু মন্তব্য ও দেখলাম যেমনঃ “তার মামলা কেন খারিজ হয়ে গেল? মিথ্যাচার করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্য প্রিয়া জঙ্গিকে অবিলম্বে ফাঁসি দেয়া হোক।” এ বিষয়টা নিয়ে আরেকটা লেখা লিখেছি । এবং আমার মনে হয় যে প্রিয়া সাহাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটু বেশিই মাতামাতি শুরু হয়ে গিয়েছে ।
আসলে নিজের অজান্তেই আমরা নিজেদের গোত্রের মানুষদের প্রতি একটু পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করি । এবং আমরা নিজের অজান্তেই ধর্ম, বর্ণ, জাত পাত, জাতীয়তা, পরিবারের প্রেক্ষাপট বা অরিজিন, ইত্যাদি ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করি ।
মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই, তাই তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবেনা । কোন অত্যাচারী যদি মুসলমান হয় তার বিরুদ্ধে কিছু বললেও গোটা দেশটা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে । কোন মুমিন কোন দোষ করলে সেটা গোপন রাখতে হবে । এবং দোষটা অন্য কোন সম্প্রদায়ের উপর চাপানো যায় কিনা সেটা দেখতে হবে । উদাহরণ সরূপ, প্রিয়া সাহা এমন মন্তব্য করলে তার ঘর বাড়ি তো জ্বালানো হবেই । অথবা সে নিজেই নিজের ঘরে আগুন দিয়েছে অথবা মিথ্যা কথা রটিয়ে মুসলমানদের বিপদে ফেলছে ।
কিন্তু কোনদিন ভেবে দেখেছেন কি, কেন কোন মোল্লা আজ পর্যন্ত মাদ্রাসা গুলোতে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের প্রতিবাদ করলো না ? আর মডারেট রা “তারা ছহিহ মুসলিম নয়” অথবা “মুমিনরা ধর্ষণ করে না, ধর্ষকরা মুমিন সাজে” ইত্যাদি বলে পিছলে যাওয়ার চেষ্টা করে কেন? আরেকটা উদাহরণ হল কোথাও কোন সন্ত্রাসী হামলা হলে সেটা “ইহুদি নাসারাদের চাল” অথবা “আমেরিকা অস্ত্র সাপ্লাই দেয়, আমেরিকাই সব চেয়ে বড় সন্ত্রাসী” ইত্যাদি বলে পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা ।
তবে আজকে যে বিষয় টা নিয়ে লিখবো ভাবছিলাম, সেটা হচ্ছে ভালো খারাপের মানদণ্ড নিয়ে । নাস্তিকরা ভালো খারাপের পরিমাপ কিভাবে করবে? বা তাদের ভালোমন্দের মানদণ্ড কি? তাদের তো কোন কিতাব বা গাইড লাইন নেই?
আসলে প্রশ্নটা হওয়া উচিৎ “মানুষের” ভালো মন্দের মানদণ্ড কি হবে? আমরা কেন ধরে নেব যে নাস্তিকদের ভালো মন্দ আর আস্তিকদের মানদণ্ড আলাদা হবে? সব মানুষের জন্যই তো ভালো এবং মন্দ একই হওয়া উচিৎ, তাই নয় কি? ভালো আর মন্দ , ন্যায় আর অন্যায়, এগুলো কিন্তু খুব সহজ বিষয় নয় ।
ভালো মন্দ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয়, পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে, এবং স্থান কাল, পাত্রেও পরিবর্তন হয়ে যায় । তবে একটা বিষয় নিশ্চিত যে ভালো মন্দ কখনো চূড়ান্ত হতে পারেনা । কোন বইতে ভালো কোনটা বা খারাপ কোনটা লেখা থাকলেই সেটা ভালো বা খারাপ হয়ে যায় না, বিশেষ করে সে বইটা যদি ১৪০০ বছর আগে লেখা একটি ভিন্ন কালচারের বই হয় ।
এই প্রশ্ন টা যে শুধু মুমিন মুসলমান রাই করে তাই নয়, এটা খৃস্টানরাও করে । পার্থক্য হচ্ছে মুমিনরা মনে করে তাদের কিতাবে যা আছে সেটাই ঠিক । সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে । তারা এটাও বলে যে ভালো খারাপ যদি বই তে না লেখা থাকে তবে এর মানদণ্ড কি হবে? আপনার কাছে যেটা ভালো সেটা অন্যের কাছে ভালো নাও হতে পারে ।
তাহলে ভালো মন্দ কিভাবে বিচার করবেন? আসলে মানুষ যেহেতু সামাজিক জীব, তাই ভালো মন্দ মানুষ সমাজ দিয়েই বিচার করে। সমাজে যেটা গ্রহণযোগ্য হয় সেটাকেই আমরা ভালো বলি, এবং সমাজে যেটা গ্রহণযোগ্য নয়, বা যেটাকে ক্ষতিকর বলে মনে হয়, সেটাকেই আমরা খারাপ বলি।
মানুষ সমাজবদ্ধ হওয়ার কারণে ব্যক্তির চেয়ে দলের স্বার্থই মানুষ বড় করে দেখে । মানুষ একজনের কষ্ট আরেকজন অনুভব করতে পারে । মানুষ জানে যে আমি যদি কষ্ট করে উপার্জন করি এবং তা যদি আরেকজনে জোর করে নিয়ে যায় তবে সেটা খারাপ হবে। এখন আমার কল্লা কাটা গেলে সেটা আমার জন্যে যতোটা খারাপ হবে আরেকজনের কল্লা কাটা গেলেও সেটা তার জন্য ততটাই খারাপ হবে, সেটা আমরা বুঝতে পারি ।
তাই মানুষ নিজেদের মধ্যে কিছু নিয়ম কানুন তৈরি করে নিয়েছে । এই নিয়ম গুলি কোথাও প্রথা হিসাবে চালু হয়েছে, পরে আইন হয়েছে, কিছু আইন আলোচনার মাধ্যমে, যুক্তি তর্কের মাধ্যমে এসেছে, আর কিছু নিয়ম কানুন ও আইন হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে।
এই নিয়ম এবং আইন, এই রীতি নীতি, রেওয়াজ – এগুলো সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়েছে । এক সময় দাস প্রথা বৈধ ছিল, এবং দাস কেনা বেচা হত । বহু বিবাহ এবং বাচ্চা মেয়েদের বিয়ে করা স্বাভাবিক ছিল । কিন্তু এখন আমরা জানি যে এটা অমানবিক । আমরা ধীরে দিরে আরও উন্নত আর সভ্য হচ্ছি এবং আমরা অতীতের ভুল গুলো বুঝতে পারছি । হয়তো ১০০ বছর পর আমরা এখন যে সব কাজ গুলো করি, সেগুলো অন্যায় বা অমানবিক মনে হবে ।

