সবাইকে ইদের শুভেচ্ছা

মানুষের একটি স্বভাব হল সব কিছুতে একটা লেভেল প্রদান করা। যেমন – ও একটা রিক্সা ওয়ালা, ও তো অশিক্ষিত হবে। ও একটা নাস্তিক, ও যে কোন অপরাধ করতে পারে, বাধা কিসের? ও দাড়ি ওয়ালা টুপি ওয়ালা মুমিন, ও কোন মিথ্যা বলতে পারেনা, ইত্যাদি।

এই লেভেল দিয়ে মানুষের কিছু সুবিধা আছে। একজন ক্লাসিফাইড হয়ে গেলে তার সম্পর্কে কিছু তথ্য বা ধারনা পাওয়া যায়। এই তথ্য থেকে আমরা কিছু সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নিতে পারি। কিন্তু এই লেভেল গুলি সব সময় সঠিক হয় না এবং এই গুলি সমাজে স্টেরিও টাইপ বা Faulty Generalizations তৈরি করে ।

যেমন আপনি সকাল ৯ টায় প্রতিদিন রাস্তায় জ্যাম পান তাই ধরে নিলেন প্রতিদিন এই সময় জ্যাম হবে। আপনার এই সিদ্ধান্ত টা সঠিক হলেও সব দাড়ি ওয়ালা টুপি ওয়ালারা সৎ এবং সব নাস্তিকরা অসৎ এই সিদ্ধান্তে যদি আসেন এবং আপনি যদি মনে করেন সব কামলা রা মূর্খ, এবং হিন্দুরা মালু, বিধর্মীদের সাথে বন্ধুত্ব করা যাবে না – এসব ধারনা পোষণ করে আপনি সঠিক তথ্য এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবেন না।

এই জেনেরালাইজেশন গুলি সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে।

আমি যদি বলি আমি একজন ড্রামার। তাহলে আপনি কি বুঝবেন? আপনি শুধু বুঝবেন আমি ড্রাম বাজাতে পারি। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত জীবন, আমার বৈবাহিক অবস্থা, আমার বিশ্বাস, এগুলো নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এটার সাথে ড্রাম বাজানোর বিষয় অপ্রাসঙ্গিক বা irrelevant হবে।

একই ভাবে একজন নাস্তিক বলতে আমরা শুধু বুঝি যে সে সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেনা। তার সাথে তার শিক্ষা, তার অপরাধ প্রবণতা, তার সামাজিক স্ট্যাটাস, সব কিছুই irrelevant.

একজন মুমিন ও মিথ্যা বলতে পারে, চুরি করতে পারে এবং শিশু নির্যাতন থেকে শুরু করে ধর্ষণ করে হত্যা করার মতো জঘন্য কাজ গুলিও তারা করতে পারে।

আপনি একজন মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় গুলি চিন্তা না করে সে কি কাজ করছে এবং কি বলছে, সেগুলোর বিষয়ে খেয়াল করবেন তাহলে আপনি সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারবেন।

আপনি যদি বলেন – ও একটা জাহান্নামি নাস্তিক, ও মূর্খ, আহাম্মক, ওর জন্মের ঠিক নাই, ওর কথাই শুনবো না, ওকে বুঝোলেও বুঝবে না ইত্যাদি, তাহলে এটা হবে একটা লজিকাল ফ্যালাসি যেটা হল Ad hominem বা ব্যক্তিগত আক্রমণ করা।

বিশ্বাস কি যুক্তি নির্ভর? তাহলে দেখি বিশ্বাসীরা কি বলে:

একটি শিল্প কর্মের জন্য শিল্পী দরকার, একটি সৃষ্টির জন্য স্রষ্টা দরকার তাই সৃষ্টিকর্তা একজন নিশ্চয়ই আছে –

এটা যে কতো দুর্বল একটা যুক্তি, এবং মানুষের চিন্তা ভাবনা যে কতো টা সীমাবদ্ধ, সেটাই প্রমাণ করে। মানুষ নিজেকে দিয়েই তার সৃষ্টি কর্তাকে বিচার করে।

ধরে নিলাম সব কিছু যা সৃষ্টি হয়েছে তা কোন না কোন কারণে। কিন্তু সেটা যে আপনি যে সৃষ্টি কর্তা বিশ্বাস করেন সেটা, তা কি করে জানলেন?

মানুষ আসলে কুপ মণ্ডূক এবং নতুন কিছু চিন্তা করতে পারেনা। সে দেখেছে একজন মিস্ত্রী বসে বসে কিছু বানায়, তাই মানুষকেও কেউ একজন বসে বসে বানিয়েছে।

এটা হল ব্ল্যাক সোয়ান ফ্যালাসি । যেহেতু আপনি কোনদিন কোন কালো রাজহাঁস দেখেন নি তাই দাবি করছেন যে কালো রাজহাঁস নেই এবং থাকতে পারেনা। মানে আমি যেহেতু কোন কিছু নিজে থেকে সৃষ্টি হতে দেখিনি তাই কোন কিছু নিজে থেকে সৃষ্টি হতে পারেনা। আর এই একই অপবাদ তারা নাস্তিক কে দেয়। তোরা তো কোন কিছু না দেখে বিশ্বাস করিসনা । কিন্তু আপনি ও তো কোন কিছু আপনা আপনি সৃষ্টি হচ্ছে না দেখে বিশ্বাস করলেন যে কোন কিছু নিজে থেকে সৃষ্টি হতে পারেনা, এটার পিছনে নিশ্চয়ই একজন সৃষ্টিকর্তা আছে ।

কিন্তু কোয়ান্টাম ফিজিক্স পড়লেই দেখা যায় যে অনেক কিছুই কারণ ছাড়া নিজে নিজে সৃষ্টি হচ্ছে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। কোন কিছু কারণ ছাড়া বা সৃষ্টিকর্তা ছাড়া সৃষ্টি হয় না এটা ঠিক নয়।

অনেস্ট পজিশন হওয়া উচিৎ আমারা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছি এবং মহাবিশ্ব কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা জানিনা। কিন্তু এটা যে “একজন” করেছে সেটা দাবি করা ঠিক না।

যদি আমরা কালাম আর্গুমেন্ট টা মেনে নেই যে সব সৃষ্টির পিছনেই একটা কারণ রয়েছে এবং সেই কারণটাই সৃষ্টিকর্তা তবুও সেই সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানিনা।

এখানে আরেকটি লজিকের কথা উল্লেখ করি সেটা হচ্ছে একটা ফলটি এনালজি ফ্যালাসি । সেটা এরকম যে মনে করেন ধরে নিলাম একটা বাড়ি নিজে নিজে সৃষ্টি হতে পারেনা, তাই এই মহা বিশ্ব ও নিজে নিজে সৃষ্টি হতে পারে না। তাই এর পিছনে একজন সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই আছে।

এখানে ফলটি এনালজি টা এরকম যে আপনি একটা কুকুর আর বিড়ালের মধ্যে তুলনা করছেন। একটা কুকুর চতুষ্পদ গৃহপালিত প্রাণী, একটা বিড়ালও চতুষ্পদ গৃহপালিত প্রাণী, তাই একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে তাই একটা বিড়ালও ঘেউ ঘেউ করবে।

আপনি যেহেতু দেখেছেন যে বাড়ি তৈরি করতে একজন মিস্ত্রী লাগে তাই এখন আপনি ধরে নিচ্ছেন যে এই মহাবিশ্ব কেউ “একজন” বানিয়েছে, যে মানুষের মত চিন্তাশীল। মানুষের মত সব দেখে, শুনে, এবং মানুষের মতো তেল দিলে খুশি হয় এবং মানুষের জীবনের সুখ দুঃখ নিয়ন্ত্রণ করে।

কোরান হাদিস মতে কিন্তু তাই আছে। আমাদের সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে, মাটি দিয়ে আদমকে সৃষ্টি করে তার মধ্যে রুহ ফু দিয়ে ভরে দিয়েছে। এবং মানুষ সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য হল সেই সৃষ্টিকর্তা চায় তাকে আমরা ইবাদত করি।

কিন্তু সত্যি কথা হল এসবই কল্পনা । এই মহাবিশ্ব যে প্রাকৃতিক ভাবে আসতে পারেনা, তার প্রমাণ কি? আমরা এখন পর্যন্ত যে প্রমাণ পেয়েছি তাতে এটা প্রাকৃতিক ভাবেই এসেছে বলেই মনে হয় আর একজন সৃষ্টিকর্তা করেছে, তার বিন্দুমাত্র প্রমাণ নেই।

বিশ্বাস করতে হয় প্রমাণের পর, আগে নয়। সবাইকে ইদের শুভেচ্ছা।

images (11)

 

Leave a comment