বাঙলা বাঙালিয়ানায় লালিত লোকায়ত সমাজ সংস্কৃতির চিরায়ত ঐতিহ্য ধারন করেই হাজার বছর ধরে আমরা গর্বিত বাঙালি, শতবর্ষের ঔপনিবেশিক সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন হয়ত জাতিগত সেই শিঁকড়ের পরিচয় কখনই সম্পূর্ণ মুঁছে ফেলতে পারেনি। আমাদের চিরায়ত লোকাচার, পেশাগত যাপিত জীবিকা, পোশাক-পরিচ্ছদ-সাজ-সজ্জা, ভাষা-সাহিত্য, পারিবারিক-সামাজিক প্রথা, আচার-অনুষ্ঠান বৈশ্বিক আর সকল জাতিগোষ্ঠী থেকে ভাষাভিত্তিক স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ঠ্যে, অনন্য পরিচয়ে গর্বিত স্বকীয়তা এনে দিয়েছে। এই বাঙালি পরিচয়ে জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত বাংলায় ভাষন যেমন আমাদের গর্বিত করে, তেমনি গর্বিত করে এই বাঙালি পরিচয়েই কবিগুরুর সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্তি কিংবা সত্যজিত রায়ের অস্কার পুরস্কার লাভ।
বর্ষবরণ বা বর্ষবিদায়ে আজকের এ আয়োজন আমাদের বৈশাখ-চৈত্রকে নিবিঢ়ভাবে মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, ষড়ঋতুর বৈচিত্রময় চিরশ্যামল বাংলার গ্রীষ্ম-বর্ষা শরৎ-হেমন্তকে, ঋতুভিত্তিক বৈচিত্রময় পরশ রেখে যায় রৌদ্র-শৈত্য-খরতাপ, ঝড়-জল-বন্যার প্রভাব। কৃষিনির্ভর এ বাংলাকে চাষাবাদের স্বার্থেই মনে রাখতে হয় ষড়ঋতু কেন্দ্রিক সৌরবর্ষের হিসাব, হাতের নাগালেও রাখতে হয় দিনক্ষন হিসাবের হালনাগাদ বর্ষপঞ্জিকা, কারন এই বৈশাখ-জৈষ্ঠ শরৎ-হেমন্তের সাথেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের বঙ্গীয় বহুমুখী কৃষিভিত্তিক জীবন-জীবিকা, বহু চড়াই-উতরাই পেরুনো জাতিগত ভাগ্যের চাঁকা গড়ানোর সূদীর্ঘ কালের বর্ণিল ইতিহাস। তাকে বিশেষ কোন প্রাতিষ্ঠানিক উপাসনা ধর্মের মোড়কে, মিথ্যের খোলসে আবদ্ধ করে ফেলা যায়না। বৈশাখ-জৈষ্ঠের সাথে ঐশী কোন উপাসনা-আরাধনা কামনা-বাসনা-প্রার্থনা নেই, এই বৈশাখ-জৈষ্ঠের সাথে কোন বিশেষ ধর্মের পুজনীয় দেবদেবী তন্ত্র-মন্ত্র যাগ-যজ্ঞের মতো ঐশী কোনকিছুর সম্পৃক্ততা খোঁজা অনভিপ্রেত, সে সব উৎসববিমুখ উদ্দেশ্যসন্ধানী অর্বাচীনের কাজ অথবা দূরকোন ভূখন্ড থেকে অদূর অতীতে ধেয়ে আসা উদ্বাস্তুর কোন বৈরী সাংস্কৃতিক আগ্রাসী ঔপনিবেশিক প্রেতাত্মার গাত্রজ্বালাজাত উষ্মাপ্রকাশ বৈ ভিন্নকিছু নয়, তার সাথে বাঙালি বাঙালিয়ানার আদৌ কোন সম্পর্ক নেই। বরং তারা-ই হয়ত বাঙালির শেঁকড়কে ভয় পায়, সার্বজনীন উৎসব আয়োজনে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ দেখলেই আঁতকে ওঠে, ‘পয়লা বৈশাখটা আবার কী?’
পয়লা বৈশাখ বা পহেলা বৈশাখ হলো বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ বা বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নিয়ে থাকে। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন লোকায়ত সাংস্কৃতিক উৎসব হিসাবে বিবেচিত। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে বাংলাদেশের প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল এবং ভারতে ১৫ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ উৎসব হিসাবে পালিত হয়। বাংলা একাডেমী কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে, তাছাড়া প্রাচীন যে কোন পঞ্জিকাতেও এই বিষয়ে মিল রয়েছে। এই দিনটি বর্তমানে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে গৃহীত। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা দিনটি নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ্য হিসাবে সাধারণত নবোদ্যমে বরণ করে নেয়।
পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক ভিত্তিমূল অনুসন্ধানে যতোদূর জানা যায়, ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে মুগল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন বলেই বেশিরভাগ পণ্ডিত মনে করেন, যদিও সম্রাট আকবর কোন বঙ্গীয় বাঙালি ছিলেন না। ওই সময় বঙ্গে শক বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হতো, যার প্রথম মাস ছিলো চৈত্র। বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রথমে ‘তারিখ-ই-এলাহী’ বা ‘ফসলি সন’ নামেও পরিচিত ছিলো। ১৫৮৪ সালের ১০ বা ১১ মার্চ তারিখে এটি প্রথম ‘বঙ্গাব্দ’ নামে প্রচলিত হয়। ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটগণ প্রথমে হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো বিধায় বিভিন্ন সময় বিশৃঙ্খলা দেখা দিতো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের প্রাথমিক লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর তখন বাংলা সনের প্রবর্তনে মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জি সংস্কারের আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহ উল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন।
এ নতুন সালটি সম্রাট আকবরের রাজত্বের ২৯তম বর্ষে প্রবর্তিত হলেও তা মূলত গণনা করা হয় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে। সম্রাট আকবর ৯৬৩ হিজরী, ১০ রবিউল আউয়াল, রোজ শুক্রবার, ১৪৭৯ শাকাব্দ, ১৬১৪ বিক্রমাসম্ভাত এবং ইংরেজি ১৫৫৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। একই বছর, অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর, এবং ৯৬৪ হিজরির মুহররমের ১ তারিখে মাত্র ১৩ বছর বয়সে সম্রাট হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্যকে ২য় পানিপথের যুদ্ধে পরাজিত করেন। পানিপথের যুদ্ধে সম্রাট আকবরের বিজয়কে মহিমান্বিত করে রাখবার জন্য এবং অধিকতর পদ্ধতিগত উপায়ে রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে এ বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়েছিলো। সম্রাট যে মাসে সিংহাসনে অরোহণ করেন, তার নিকটতম হিজরি বছরের ১ম মাসকে ভিত্তি ধরা হয়। ৯৬৩ হিজরির ১ মহররম ছিল নিকটতম। ওই বছর শকাব্দের ১ বৈশাখ এবং হিজরির ১ মহররম একই দিনে এসেছিলো। বৈশাখ হলো শকাব্দের ২য় মাস, চৈত্র ১ম মাস। ৯৬৩ হিজরির ১ মহররমকে বাংলা ৯৬৩ সনের ১ বৈশাখ পরিচিহ্নিত করে বাংলা সন শুরু করা হয়। অর্থাৎ ১, ২, ৩ – ঠিক এভাবে হিসেব না করে মূল হিজরি সনের চলতি বছর থেকেই বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। ফলে জন্ম বছরেই বাংলা সন ৯৬৩ বৎসর বয়স নিয়ে যাত্রা শুরু করে।
খ্রিস্টপূর্ব ১৫ সালে ভারতে শক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় বলে ঐতিহাসিকভাবে জানা, শক সনের স্মারক হিসেবে ৭৮ খ্রিস্টাব্দে শাকাব্দ চালু করা হয়। সৌরভিত্তিক শাকাব্দের রবিমার্গের দ্বাদশ রাশির প্রথম মেঘ অন্তর্গত পূর্ণচন্দ্রিকাপ্রাপ্ত প্রথম নক্ষত্র বিশাখার নামানুসারেই বৎসরের প্রথম মাসের নাম রাখা হয় বৈশাখ। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন যে, নাক্ষত্রিক নিয়মে বাংলা সনের মাসগুলোর নাম নিম্নেবর্ণিত নক্ষত্রসমূহের নাম থেকে উদ্ভূত হয়েছে: যেমন
বৈশাখ বিশাখা
জ্যৈষ্ঠ জ্যেষ্ঠা
শ্রাবণ শ্রাবণা
ভাদ্র ভাদ্রপদা
আশ্বিন আশ্বিনী
কার্তিক কার্তিকা
অগ্রহায়ণ অগ্রহায়ণ
পৌষ পৌষা
মাঘ মঘা
ফাল্গুন ফাল্গুনী
চৈত্র চিত্রা।
‘ফসলি সন’ যখন প্রবর্তিত হয়, তখন কিন্তু ১২ মাসের নাম ছিল : কারওয়াদিন, আরদি, ভিহিসু, খারদাদ, তীর, আমরারদাদ, শাহরিয়ার, মিহির, আবান, আয়ুব, দায়, বাহমান ও ইসকান্দার মিয। যা পরবর্তী পর্যায়ে সেগুলো বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
তাহলে এটা স্পষ্ট যে, বর্তমান আধূনিক বাংলা সন মূলত হিজরী চান্দ্রসন, বাংলা সৌরসন এবং গ্রেগরীয় ইংরেজি সনের সংমিশ্রণে তৈরি একটি স্বতন্ত্র সন। বাঙালি যেমন মিশ্র জাতি তেমনি বাংলা সনও মিশ্র সন এই আর কি!
সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন অবশ্য প্রত্যেকের বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্যবাধকতা থাকায়, এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবেরও আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি পরবর্তীতে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, কালের বিবর্তনে যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমান এই পর্যায়ে এসেছে পহেলা বৈশাখ। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিলো একটি হালখাতা তৈরি করা মাত্র। হালখাতা বলতে যদিও একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হলো বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত স্বর্ণের দোকান বা মুদি দোকানে।
একটা সময় ছিলো, যে সময় পহেলা বৈশাখ পালিত হতো শুধু খাজনা দেওয়ার সমাপ্তির পর শুভ মূহুর্ত হিসেবে। তারপর হালখাতার প্রথা এর সাথে যুক্ত হয়। তবে কালের পরিক্রমায় সংস্কৃতিমনা বাঙালির মন সেখানেই আটকে রাখা যায় নি।
আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়, এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওযা যায়। পরবর্তীকালে ১৯৬৭ সনের পূর্বে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। ধারণা করা হয়, ১৮৬৪ সালে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে প্রথমবারের মতো পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান করা হয়। মধ্যযুগে বৈশাখী মেলার ইতিহাস খূব একটা স্বচ্ছ নয়। তবে এ মেলার বহুল প্রচলন যে শতবর্ষ ধরেই ছিলো সেটি স্বীকৃত বিষয়।
আধুনিককালে এসে বৈশাখী মেলা শহরে ব্যাপকভাবে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহ্বান। পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের পর পর ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃতপক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ। ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা। ১৯৭৭ সালে সাহিত্যপত্র ‘সমকাল’-এর সহযোগিতায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রথম বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। এ মেলা আয়োজনে বরেণ্য চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান, ফোকলোরবিদ শামসুজ্জামান খানসহ আরো অনেকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো। প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই মেলার নানামুখী উদ্দেশ্য ছিলো। যার মধ্যে প্রথম ও প্রধানতমটি হলো : বাঙালির ঐতিহ্যকে নাগরিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এই চেষ্টা যে ভালোভাবেই সফল হয়েছিলো তা’ পরবর্তী সময়ে রাজধানীর আরো নানাবিদ স্থানের বৈশাখী মেলার আয়োজন দেখে সহজেই অনুধাবন করা যায়। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনও তিনযুগের বেশি সময় ধরে বৈশাখী মেলার আয়োজনে সমূহ ভূমিকা রেখে আসছে।
এই নববর্ষে বর্ষবরণের উৎসবে একযোগে নব আনন্দোল্লাসে, উৎসবের রঙে রঞ্জিত হয়ে উচ্ছ্বাসে আন্দোলিত হবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ভুটান, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড সহ দক্ষিন এশিয়ার অধিকাংশ দেশ। তাকে ভিন্ন কোন অজুহাতে, কপট চোখরাঙানিতে বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে আক্রান্ত জড়াজীর্ণ সংকীর্ণতায় যে আবদ্ধ করা যাবেনা, তার প্রমান আজকে ঘর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসা লাখোমানুষের ঢল, যেখানে সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে, সব পরিচয় ভূলে, সকল ঠুনকো বাঁধা ঠেলে, বাংলা বাঙালিয়ানার মহাস্রোতে একাকার হয়ে যাওয়া বর্ষবরনে উল্লাসিত আত্মিক- সাংস্কৃতিক চৈতন্যববোধের শোভাযাত্রা কিংবা মঙ্গল শোভাযাত্রা মূলতঃ আবহমান বাংলা বাঙালিয়ানা পেশাগত ঐতিহ্যের ধারক-বাহক, বহুজাতিক-উপজাতিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সীমান্ত পেরুনো অভিন্ন প্রাণের উৎসব। বর্ষবরণ-বর্ষবিদায় নবান্ন বা বসন্তবরণ বা শৈত্যের পীঠা উৎসবের মতোই অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জাতিগত অভিন্ন সংস্কৃতির ধারক। হাজার বছরের বাঙালি বরাবরই বারোমাসে তেরো পাবনে বহুমাত্রীয় সাংস্কৃতিক বৈচিত্রে সদাসমৃদ্ধ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র-সঙ্কটে তাঁকে শুধুই আমদানি নির্ভর বা ঔপনিবেশিক আগ্রাসনে আমস্তক অবনত হতে হয়নি কখনো।
বৈচিত্রময় স্বাদের বাহারি খাদ্যে ভোজন-বিলাসী বাঙালিকে শুধু পান্তা-ইঁলিশে আঁটকে ফেলাটা কর্পোরেট কালচার বা পুঁজিবাদী সংযোজন। এটা একটি অনন্য উপাদান হতে পারে, তবে একমাত্র নয়, আমরা বহুপদের বহুস্বাদের বিচিত্র খাদ্যেই বছরের প্রথম দিনের তালিকা সাজাই। তেমনি পহেলা বৈশাখে বিশেষ রঙে সঙ সাজার সমর্থনও সাথে যায়না, আমরা বৈচিত্রময় রঙেই নতুনভাবে নবসাজে নিজেদের প্রকাশ করায় অভ্যস্ত, সেখানে বিশেষ কালার কোড বেমানান, উৎসবের রঙ বরাবরই বহুরঙে বর্ণিল। কালের পরিক্রমায় এ উৎসবে হয়তো আরো বহুল রঙ্গিন পালক সংযোজন বিয়োজন বিবর্তন হয়ে যুগের দাবী মেটাতে আরো সমৃদ্ধ হবে এমনটাই স্বাভাবিক। সেই সাথে উৎসবে থাকতে পারে আঞ্চলিক ভিন্নতা, যেমন পাহাড়ে বৈসাবি উৎসব। সাম্প্রদায়িক সকল কুপমন্ডুকতার অন্ধকার তাড়াতে বাঙালির ভাষাভিত্তিক নৃতাত্বিক ঐক্যবদ্ধ পরিচয় একযোগে জানান দিতেই পহেলা বৈশাখের মতো সার্বজনীন এমন আয়োজন আজ বড় প্রয়োজন। বৈশাখ আসে অন্যরকম স্বপ্ন আর অমিত সম্ভাবনার ফুলঝুড়ি নিয়ে। জরা ও জীর্ণ, দীনতা ও নীচতাকে পদতলে পিষ্ট করে সুন্দরের পথে অবিরাম হাঁটার ও শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার অঙ্গীকারের দিন বৈশাখ। কয়েকশ’ বছর ধরে জীবনের নানা অনুষঙ্গকে ধারণ করে এ দিনটি বাঙালিরা উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে এমনভাবেই উদযাপন করে আসছে।
আগে দু-তিন গ্রামের সীমান্তবর্তী স্থানে, অথবা নদীর ধারে, বটতলায় বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হতো। এসব মেলায় নামতো হাজার হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ঢল, মেলায় থাকতো কাঁচের চুড়ি, রঙ-বেরঙের ফিতা, তাঁতের শাড়ি, নকশা করা হাতপাখা, কামার ও কুমোরের দোকান, মুড়ি-মুড়কি-খই, সন্দেশ, বাতাসা, মিষ্টি, মাটির তৈরি খেলনা, পুতুল, ঘুড়ি, নাটাই, গুলতি, অলংকার, তৈজসপত্র, বেলুন, বাঁশি, ফলমূল ইত্যাদি। আমাদের গ্রামীন কুটিরশিল্প হস্তশিল্পজাত পন্যের বিক্রয় এবং উম্মুক্ত প্রদর্শনী। আর বিনোদনের জন্যে থাকতো নাগরদোলা, বায়োস্কোপ, জারি-সারি-ভাটিয়ালি গানের আসর, কবিগান, ষাড়ের লড়াই, লাঠিখেলা, পুতুল নাচ, নৌকা বাইচ, কুস্তি খেলা ইত্যাদি। কোথাও কোথাও বসতো জুয়ার আসরও! বৈশাখী মেলার শিশু-কিশোরদের প্রধান আকর্ষণ ছিলো নাগরদোলা ও বায়োস্কোপ, নাগরদোলার প্রচলন এখনো টিকে থাকলেও বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বায়োস্কোপকে এখন আর মোটেও দেখা যায় না।
ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সকল শ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকে বরাবর-ই। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় বিভিন্ন রঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখ উৎসবের একটি অন্যতম প্রতীকি আকর্ষণ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
আমি গর্বিত এমন বাঙালি পরিচয়ে, এটা আমার ভাষা সাহিত্য সাংস্কৃতিক সামাজিক এবং জাতিগত মৌলিক পরিচয়। নাম, ধাম, ধর্ম, দেশ, বেশ, কেঁশ বরাবরই পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু জন্মদাতা বাবা-মা এবং আজন্মলালিত জাতিগত সংস্কৃতিক পরিচয় কোনভাবেই পরিবর্তন করা বা অন্যের উপর মোটেও চাপিয়ে দেয়া যায়না। শেঁকড়কে অস্বীকার করার প্রবণতা সভ্যতাবিমূখ বর্বরতা- চরম মূর্খতা। ব্যক্তিগত সব সংকীর্ণ পরিচয় ভুলে আমরা জাতীয় পরিচয়ে গর্বিত বাঙালি, বাঙালির প্রাণের টানে তাই প্রাণমেলাতে সমবেত কন্ঠে মিলি, “এসো হে বৈশাখ…এসো এসো” বলে। সমগ্র বাঙালি তথা বিশ্বমানবতার সার্বিক মঙ্গল কামনায় মিলিত হই, নতুন বছরের নতুন কর্মপ্রেরণার প্রারম্ভিক মহড়া, মঙ্গল শোভাযাত্রায়…! শোভাযাত্রা বা মঙ্গল শোভাযাত্রা, হাঁটুগেড়ে দুহাত তুলে বিশেষ কারও কাছে কামনা-বাসনা-প্রার্থনা নয়, প্রকৃতির কাছে করুনা চেয়ে নয় বরং প্রকৃতিকেই জয় করার এক অদম্য প্রত্যয়ে, বিক্ষুদ্ধ প্রকৃতির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় পেশাগত নব কর্মপ্রেরণার যৌথমহড়া, টোটেম-ট্যাবু-ব্রত-জাদুবিশ্বাসের পরিক্রমায় আদিম মানুষের কর্মকৌশলের সমবেত প্রকাশ মাত্র, সেখানে মঙ্গল-অমঙ্গল দাতা-গ্রহীতা কামনা-বাসনা-প্রার্থনার অবকাশ নেই। নববর্ষবরণে বাঙালির পহেলা বৈশাখ লোকায়ত সংস্কৃতির উদযাপিত একটি বিশেষ উৎসব মাত্র।
শুভ কামনা সকলকে, বাংলা বাঙালিয়ানা কৃষ্টি-সংস্কৃতিক চেতনায় যারা আজ বাঙালির অভিন্ন শিঁকড়ের সন্ধানে, বাঙলা-বাঙালি প্রাণে জাতিগত ভ্রাতৃত্বের টানে, সার্বজনীন এই মহাস্রোতে সম্মিলিত হয়েছেন।
শুভ নববর্ষ-১৪২৬
নতুন বছরে নবোদ্যমে কর্মময় রঙিন স্বপ্নে আন্দোলিত হউক আমাদের সমন্বিত অগ্রযাত্রা, মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিটি ক্ষুদ্র এমন পদক্ষেপ থেকে…এমনই প্রত্যাশা।
#ভবঘুরে_বিদ্রোহী
#ভবদ্রোহী

