যুক্তিতর্ক করার আগে ভালোরকম যুক্তি শেখা দরকার। যুক্তি শেখার সাথে সাথে কুযুক্তি কী জানা দরকার। নতুবা যুক্তির নামে কুযুক্তি দিয়ে মানুষ অযথা চিল্লাচিল্লি শুরু করে। এতে যুক্তি তর্কের ফলে সংশ্লেষণ বা সিনথেসিসটি ঠিকমত হয় না; থিসিস এন্টিথিসিসের দ্বারা সিনথেসিস না হলে তর্ক বিতর্কের কোন মূল্যই থাকে না।
নাস্তিক বনাম আস্তিক পেইজে অনেকে তর্কের নামে যা বলে তা কুতর্ক ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশেষত আস্তিকরা এই মূর্খামিটা বেশি করে। কারণ কোন কিছু না জেনে না বুঝে আস্তিক বা মুমিন হওয়া যায়, কিন্তু নাস্তিক হতে গেলে অনেক বেশি জানতে হয়।
এবার দেখা যাক, কুযুক্তি বা ফ্যালাসি কী এবং কত প্রকার? মুৃমিন কিংবা নাস্তিক সবাইকে সতর্ক হতে হবে, নতুবা অসাবধান বশত নিজের অজান্তে কুযুক্তিকে আপনি যুক্তি মনে করে ভুল করবেন অহরহ।
১. এড হোমিনেম কুযুক্তি (Ad Hominem Fallacy) : কোন ব্যক্তি একটি কথা বলল, আপনি সেটিকে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করার দিকে না গিয়ে ঐ ব্যক্তি ও তার চৌদ্দ গোষ্টীর চরিত্র নিয়ে পড়লেন–“ও খারাপ, ওর মা খারাপ, ওর ধর্ম খারাপ” ইত্যাদি। এ ধরনের কুযুক্তির নাম এড হোমিনেম। মুমিন ও বিশ্বাসীগণ এই কাজটা ভাল পারেন।
শুভন কুমার বলল, “নবি মুহাম্মদ ১৩ টি বিয়ে করেছেন যা স্পষ্টতই অনৈতিক কাজ।”
এখন আব্দুল করিম বললেন, “তোদের শিব ৪০০০ হাজার বিয়ে করেছে। দূর্গামা ছেলের সাথে সেক্স করেছে। হিন্দুরা লিঙ্গ আর যোনি পূজা করে, গোমূত্র পান করে ইত্যাদি।”
মুমিনের এগুলো কুযুক্তি, কারণ এতে নবি মুহাম্মদের নামে আনা অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হল না।
২. আবেগ নির্ভর যুক্তি (Appeal to Emotions) : কোন ব্যক্তির বক্তব্যকে মিথ্যা প্রমাণ করার বদলে ঐ ব্যক্তি বা উপস্থিত শ্রুতাদের আবেগের কাছে আবেদন করাকে ‘আপীল টু ইমোশান’ বলে।
যেমন, জাহিদ বলল, “আল্লাহ নাই।”
উত্তরে মুমিন বলল, ” শালার বেটা মরলে বুঝবে। আল্লাহ নাই বললে চিরকাল তুই দোজখে থাকবে। আমরা মুসলমানের বাচ্চা, এই কথা বলা আমাদের সাজে না। তোর মা তোরে জন্ম দিয়ে ভুল করেছে ইত্যাদি।”
এতে কি “আল্লাহ নাই” দাবিটি নাকচ হল? না, হয়নি। আজরাইয়া প্যাঁচাল পারা হল মাত্র।
৩. হাঁদারামের যুক্তি ( Straw man Fallacy):
বিপক্ষের তার্কিক আসলে যা বলেনই নি, বা বিপক্ষের তার্কিকের পক্ষে একটি দুর্বল যুক্তি খাড়া করে সেই যুক্তিকে খণ্ডন করার নাম স্ট্র-ম্যান ফ্যালাসি বা খড়ের মানুষ বানিয়ে তার সাথে যুদ্ধ করার কুযুক্তি বলে ।
ধরুন, বক্তা ক বলেছেন, আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না।
বক্তা খ বলছেন, বক্তা ক আসলে ফ্রি সেক্স করার জন্য ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না। ফ্রি সেক্স খুব খারাপ। ফ্রি সেক্সে অনেক সামাজিক সমস্যা তৈরি হয়। ( এরপরে তিনি দীর্ঘ পাঁচঘণ্টা ফ্রি সেক্সের ভাল খারাপ বিষয় নিয়ে বক্তব্য দিয়ে গেলেন। অথচ বক্তা ক ফ্রি সেক্স বিষয়ক কিছু উল্লেখই করেন নি।)
অথবা,
কোন ব্যক্তি বলল, “জাহান্নাম জান্নাত এ সব কিছু আমি বিশ্বাস করি না । তুমি কি দেখেছো এইসব?” মুমিন তখন হাঁদারামের যুক্তি দেয় :
# তা হলে কোরআনে আল্লাহ কেমনে বলল জান্নাত আছে?
# আল্লামা শফি হুজুর কেমনে বলল জান্নাত আছে, উনি কি মিছা বলেছেন?
# আপনি যে না দেখে বিশ্বাস করেন না, আপনি কি আপনার বাপমাকে যৌনমিলন করে আপনার জন্ম হতে দেখেছেন?
৪. লাল হেরিং কুযুক্তি( Red Herring Fallacy) বিবেচ্য বিষয়(Fact in issue) এক রকম, আর আপনি কুযুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন আরেক বিষয়ে। এই পরিস্থিতিতে আপনি লাল হেরিং কুযুক্তি দিলেন। যেমন, ধরুন বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে–
“মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আছে কিনা?”
এখন আপনি যুক্তি দিলেন মানুষ যে কাজটি (চুরি) এখন করল, তার বদলে অন্য একটি কাজও করতে পারত। এমন কি ভুল করেও মানুষ অন্য কাজ করে ফেলতে পারে। তার মানে মানুষের সামনে বিকল্প আছে এবং মানুষ তার কর্ম চয়েস বা নির্বাচন করতে পারে।
তা হলে যুক্তি দিয়ে আপনি প্রমাণ করলেন, মানুষ বিকল্প কর্ম করতে পারে, তার চয়েসের সুযোগ আছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, “মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা” আছে।
এই কুযুক্তিটি খুবই সুক্ষ্ণ, তাই মুমিনরা ব্যবহার করতে পারে না। এ কুযুক্তি প্রায়শই নাস্তিকরা ব্যবহার করে মুমিনদের ধরাশায়ী করে দেয়। ধরাশায়ী হয়েও মুমিন বুঝে না। শুয়ে থেকে বলে, “তালগাছ আমার।”
৫. চক্র কুযুক্তি( Circular Fallacy): যেখান থেকে শুরু সেখানে এসে শেষ করে আবার সেখান থেকে একই জিনিস শুরু করলে তা সার্কুলার কুযুক্তিতে পরিণত হয়।
যেমন ধরুন মুমিন যুক্তি দিচ্ছে : “আল্লাহ সত্য না হলে কোরআন সত্য হল কেমনে? কোরআন সত্য না হলে মুহাম্মদ যে রাসুল তা সত্য হল কেমনে? রাসুল সত্য না হলে ইসলাম কেমনে সত্য হল? ইসলাম সত্য না হলে আল্লাহ কেমনে সত্য হইল।”
খেয়াল করেন, একটি অপ্রমাণিত বিষয়কে প্রমাণিত ধরে আরেকটি অপ্রমাণিত বিষয়কে মুমিন প্রমাণ করতে চাচ্ছে। আল্লাহ কোরআন মুহাম্মদ ইসলাম আল্লাহ কোরআন….এ ভাবে দুষ্টচক্রে ভেতরে পড়ে আছে যুক্তি। এতে কোনকিছুই প্রমাণ হয় না।
৬. কালো ও সাদা কুযুক্তি( Black and White Fallacy): যে ক্ষেত্রে অনেকগুলো অলটারনেটিভ বা বিকল্প রয়েছে, সেখানে কেউ যদি মাত্র দুইটি বিকল্প নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সে কালো ও সাদা কুযুক্তিতে পড়ে যায়। যেমন আপনি সাতটি মৌলিক রঙের কথা বিবেচনা না করে সাদা আর কালো দুটি রঙ ধরে নিলেন। ভাবলেন, যে গাভীটি আপনি কিনলেন এটি হয় সাদা নতুবা কালো হবে। যেহেতু আপনার ভাই বলল এটি সাদা নয়, অতএব আপনি নিশ্চিত হলেন গাভীটি কালো। এখানে আপনার ভুল হবার চান্স আছে; কারণ গাভী কালো, সাদা, লাল, ধুসর রঙের হতে পারে, শুধু কালো বা সাদা হবে এমন নয়।
তেমনি মুমিনরা আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণে ‘কালো ও সাদা’ কুযুক্তি দেয় :
# আল্লাহর অস্তিত্ব আছে, নতুবা সুশৃঙ্খল মহাবিশ্বের কোনো যৌক্তিক ব্যখ্যা হয় না।
# যেহেতু মহাবিশ্বের যৌক্তিক ব্যাখা আছে, অতএব, আল্লাহর অস্তিত্ব আছে।
এখানে মুমিনভাই ভুল করেছেন তিনি ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ফ্যালাসির আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি হয় সাদা না হয় কালা, এই দুইটি বিকল্প রঙের মতই ধরে নিয়েছেন যে, হয় আল্লাহর অস্তিত্ব থাকবে না হয় মহাবিশ্বের যৌক্তিক ব্যাখা থাকবে না। আসলে আল্লাহ ছাড়া মহাবিশ্বের অনেক রকম যৌক্তিক ব্যাখা রয়েছে। যেমন, মহাবিশ্বের বৈজ্ঞানিক ব্যাখায় ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রয়োজন পড়ে না।
বিজ্ঞানী লাপ্লাসকে নেপোলিয়ান বোনাপার্ট একদা প্রশ্ন করেছিলেন, “গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালক্সির গতি প্রকৃতি সম্পর্কে আপনি এত কথা বললেন, গডের কথা তো কিছু বললেন না?”
লাপ্লাস উত্তর দিলেন, “আমার মহাবিশ্বে এই ভদ্রলোক অপ্রয়োজনীয় ও অনাবশ্যক।”
সাম্প্রতিক “প্যারডক্সিকেল সাজিদ” নামে যে বইটি নিয়ে মুমিনরা লাফালাফি করছে, ওই বইয়ে উপরোক্ত ফ্যালাসি বা কুযুক্তিতে ভরপুর। লেখকের কিছু কিছু যুক্তি এত নিম্নমানের যে এগুলো ফ্যালাসিতেও পড়ে না। গন্ডমূর্খের আস্ফালন ছাড়া বইটিতে তেমন কিছু নাই। আরিফ আজাদ একটি অর্ধ শিক্ষিত মানুষ যে কিনা নিজেকে উচ্চশিক্ষিত ভাবে। আর সুযোগ পেলে লোকটি কুযুক্তি দিয়ে মহামূর্খামি প্রকাশ করে নিজে নিজে হাততালি দেয়।


Pingback: মুমিনগণ যুক্তি/কুযুক্তি শিখে বাহাস করুন! ১১ টি মুমিনীয় কুযুক্তি! | সত্যের পুজারি
Pingback: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ যুক্তি খণ্ডন পর্ব -১ | সত্যের সন্ধানী